Kalyani University Suggestion
Kalyani University B.A 7th Semester History Minor Question Answer 2026 | Last Minute Suggestion
সাহিত্যের বিভিন্ন সংরূপ ও তার প্রয়োগ
Kalyani University B.A 7th Semester History Minor Nep ছোট প্রশ্ন, বড়ো প্রশ্নের উত্তর সহ কমপ্লিট সাজেশন PDF টি পেতে.. তুমি 150 টাকা পেমেন্ট কর। পেমেন্টের পর এক সেকেন্ডের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সাজেশনটি পাবে। ধন্যবাদ। টাকা টি পেমেন্ট করার জন্য নিচে PAY বাটনে ক্লিক কর।
তুমি চাইলে সরাসরি PhonePe-এর মাধ্যমে 150 টাকা পেমেন্ট করে সাজেশন সংগ্রহ করতে পার। PhonePe নম্বর: 6295668424 (পেমেন্টের পর স্ক্রিনশট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে PDF COPY পাঠিয়ে দেব।)
My Phone Number- 6295668424
সম্পূর্ণ সাজেশন টি ইউটিউবে দেখানো হয়েছে তুমি দেখে আসতে পারো।
"প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা, তোমাদের পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো প্রয়োজনে বা কোনো প্রশ্ন থাকলে আমার সাথে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে (WhatsApp) যোগাযোগ করতে পারো। নিচের লিঙ্কে ক্লিক করলেই আমার চ্যাট বক্স খুলে যাবে: 👉 লিঙ্ক:
• এই সাজেশনের বড়ো প্রশ্ন সংখ্যা 28 টি।
ছোট প্রশ্ন প্রশ্নের উত্তর সহ কমপ্লিট সাজেশন পাবেন।
• নিরক্ষরেখে বলতে পারি এই সাজেশনেরর বাইরে কোন প্রশ্ন উত্তর আসবে না।
• ১০০% তোমরা কমন পাবে।
• এই সাজেশনের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সিলেবাস অনুযায়ী এবং ইউনিট
অনুযায়ী সাজানো রয়েছে ।
• তোমরা চাইলে খুব সহজে BUY করতে পারো।
• THANK YOU.
এখানে অল্প কিছু প্রশ্নোত্তর আপলোড করা হয়েছে যদি তোমার মনে হয় সাজেশনটি BUY করতে পারো ।
(সিলেবাস –২০২৬)
History of Europe: Fifteenth to Twentieth Century
Unit–1: The Renaissance and Reformation – Socio-economic Roots, Secularism and Humanism, Art, Architecture, Science and Literature, the Printing Revolution, Enlightenment Movement.
বাংলা: রেনেসাঁ ও ধর্মসংস্কার আন্দোলন, আর্থ-সামাজিক ভিত্তি, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও মানবতাবাদ, শিল্পকলা, স্থাপত্য, বিজ্ঞান ও সাহিত্য, মুদ্রণ বিপ্লব এবং জ্ঞানদীপ্তি আন্দোলন।
Unit–2: Seventeenth Century Crisis – Glorious Revolution in England and Great Changes in Political, Economic and State Structure – From Scientific to Industrial Revolution – Rise of Industrial Societies in Europe – The Transition Debate – American War of Independence – Birth of New Liberal and Democratic Politics.
বাংলা: সপ্তদশ শতাব্দীর সংকট, ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লব এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব থেকে শিল্পবিপ্লব, ইউরোপে শিল্পসমাজের উত্থান, রূপান্তর-বিতর্ক, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং নতুন উদারপন্থী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্ম।
Unit–3: Interpreting the French Revolution – The Philosophers and the Ideological Background – Vienna Settlement and Metternich – Birth of the Nation-States of Germany and Italy – The Napoleonic Era – The Revolutions of 1830 and 1848 – Karl Marx and the Socialist Challenge in Europe.
বাংলা: ফরাসি বিপ্লবের ব্যাখ্যা, দার্শনিকগণ ও আদর্শগত পটভূমি, ভিয়েনা মীমাংসা ও মেটারনিখ ব্যবস্থা, জার্মানি ও ইতালিতে জাতিরাষ্ট্রের জন্ম, নেপোলিয়নীয় যুগ, ১৮৩০ ও ১৮৪৮ সালের বিপ্লব এবং ইউরোপে কার্ল মার্ক্স ও সমাজতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ।
Unit–4: Roots of European Imperialism – Nazism and Fascism – The World Wars as Total Wars – From the League of Nations to the UNO – The Cold War after 1945 – Various Military and Economic Alliances – Regional Conflicts in the Bi-polar World: Vietnam, Korea, Cuba, the Middle East and Afghanistan – Détente – Aspects of Globalization.
বাংলা: ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের উৎস, নাৎসিবাদ ও ফ্যাসিবাদ, সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে বিশ্বযুদ্ধসমূহ, লিগ অব নেশনস থেকে জাতিসংঘ (UNO) পর্যন্ত, ১৯৪৫-পরবর্তী ঠান্ডা যুদ্ধ, বিভিন্ন সামরিক ও অর্থনৈতিক জোট, দ্বিমেরু বিশ্বের আঞ্চলিক সংঘাত—ভিয়েতনাম, কোরিয়া, কিউবা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তান, দেতঁ (Détente) এবং বিশ্বায়নের বিভিন্ন দিক।
Unit: 1- রেনেসাঁ ও ধর্মসংস্কার আন্দোলন, আর্থ-সামাজিক ভিত্তি, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও মানবতাবাদ, শিল্পকলা, স্থাপত্য, বিজ্ঞান ও সাহিত্য, মুদ্রণ বিপ্লব এবং জ্ঞানদীপ্তি আন্দোলন।
*****1) প্রশ্ন. ধর্ম সংস্থার আন্দোলনে মার্টিন লুথারের অবদান কি ছিল? (২) অথবা, কেন সংস্কার আন্দোলন প্রথম জার্মানিতে শুরু হয়েছিল? (১০)
ভূমিকা : জার্মানি তথা ইউরোপের ধর্মসংস্কার আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন মার্টিন লুথার (১৪৮৩–১৫৪৬ খ্রি.)। ষোড়শ শতকের গোড়ায় রোমান ক্যাথলিক চার্চ ও পোপতন্ত্রের ধর্মীয় কর্তৃত্ব, দুর্নীতি, অর্থলোলুপতা এবং নানা অনাচারের বিরুদ্ধে যে ব্যাপক প্রতিবাদ গড়ে ওঠে, লুথার তার অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। তাঁর ধর্মতত্ত্বের মূল কথা ছিল—ঈশ্বরের প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও ঈশ্বরের করুণাই মানুষের আত্মিক মুক্তির প্রধান ভিত্তি; চার্চের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান বা অর্থের বিনিময়ে পাপমোচন তার বিকল্প হতে পারে না। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর পঁচানব্বই থিসিস প্রকাশের মাধ্যমে যে আন্দোলনের সূচনা হয়, তা পরবর্তীকালে প্রোটেস্টান্ট ধর্মের প্রতিষ্ঠা এবং ইউরোপের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গভীর পরিবর্তন ঘটায়। ধর্মসংস্কার আন্দোলনে লুথারের প্রধান অবদানগুলি নিম্নরূপ—
১. পোপতন্ত্র ও ইনডালজেন্স প্রথার বিরোধিতা : ধর্মসংস্কার আন্দোলনে মার্টিন লুথারের প্রথম ও প্রত্যক্ষ অবদান ছিল পোপতন্ত্রের ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং বিশেষত ইনডালজেন্স বা মার্জনাপত্র বিক্রয়-এর তীব্র বিরোধিতা। মধ্যযুগের শেষদিকে ক্যাথলিক চার্চের মধ্যে ইনডালজেন্স প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে পাপের শাস্তি লাঘব বা পাপমোচনের সুযোগ দেওয়ার ধারণা প্রচার করা হতো। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে ডোমিনিকান যাজক জোহান টেটজেল জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে ইনডালজেন্স বিক্রি করতে শুরু করলে লুথার এর বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করেন। তাঁর মতে, অর্থের বিনিময়ে মানুষের পাপমোচন সম্ভব নয় এবং ঈশ্বরের করুণা কোনোভাবেই অর্থের মাধ্যমে কেনা যায় না। এই প্রতিবাদকে সুসংগঠিত রূপ দেওয়ার জন্য ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দের ৩১ অক্টোবর লুথার উইটেনবার্গের দুর্গ-গির্জার দরজায় তাঁর বিখ্যাত ‘পঁচানব্বই থিসিস’ (Ninety-Five Theses) প্রকাশ করেন। এই থিসিসে তিনি ইনডালজেন্সের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি ও চার্চের সংশ্লিষ্ট কার্যকলাপের সমালোচনা করেন এবং এ বিষয়ে প্রকাশ্য বিতর্কের আহ্বান জানান। মুদ্রণযন্ত্রের সাহায্যে তাঁর বক্তব্য দ্রুত জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পোপতন্ত্রবিরোধী মনোভাব শক্তিশালী হয়। লুথারের এই প্রতিবাদ কেবল একটি ধর্মীয় প্রথার বিরোধিতা ছিল না; এর মধ্য দিয়ে তিনি পোপ ও চার্চের সর্বময় ধর্মীয় কর্তৃত্বকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করান। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মতাত্ত্বিক প্রতিবাদ ক্রমে একটি বৃহত্তর ধর্মসংস্কার আন্দোলনের রূপ লাভ করে।
২. খ্রিস্টধর্মের মূল আদর্শের পুনরুজ্জীবন : লুথারের ধর্মসংস্কার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল খ্রিস্টধর্মকে তার মূল আধ্যাত্মিক ও নৈতিক আদর্শে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। তাঁর মতে, মধ্যযুগের ক্যাথলিক চার্চে ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে বহু বাহ্যিক আচার, অনুষ্ঠান এবং পুরোহিততন্ত্র এমনভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিল যে খ্রিস্টধর্মের মূল শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য অনেকাংশে আড়াল হয়ে গিয়েছিল। তাই তিনি ধর্মের বাহ্যিক আড়ম্বরের পরিবর্তে ব্যক্তির অন্তরের বিশ্বাসকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন। তাঁর ধর্মতত্ত্বের কেন্দ্রে ছিল ‘বিশ্বাসের মাধ্যমে ন্যায়সঙ্গতকরণ’ (Justification by Faith)-এর ধারণা। লুথারের মতে, মানুষ নিজের সৎকর্ম, অর্থদান বা চার্চের আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে ঈশ্বরের করুণা অর্জন করতে পারে না; বরং ঈশ্বরের প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস ও তাঁর করুণাই মানুষের আত্মিক মুক্তির মূল ভিত্তি। তিনি ঈশ্বরকে সর্বশক্তিমান এবং মানুষের মুক্তির চূড়ান্ত উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর মতে, ঈশ্বরের করুণা মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষের আত্মিক জীবন কোনো পুরোহিত বা পোপের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণাধীন হতে পারে না। ধর্মীয় জীবনে ব্যক্তির বিশ্বাস ও বিবেকের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে লুথার সাধারণ মানুষকে ধর্মের সক্রিয় অংশীদার করে তোলেন। তাঁর চিন্তায় ‘শুধু বিশ্বাস’ (Sola Fide) এবং ‘শুধু শাস্ত্র’ (Sola Scriptura) বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে; অর্থাৎ ধর্মীয় মুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বাস এবং ধর্মীয় সত্যের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বাইবেলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে পোপের ব্যাখ্যাকে ধর্মীয় সত্যের একমাত্র উৎস হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা হয়। লুথারের এই মত খ্রিস্টধর্মের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও আধ্যাত্মিক চরিত্রকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং পরবর্তীকালে প্রোটেস্টান্ট ধর্মতত্ত্বের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. অপ্রয়োজনীয় আচার-অনুষ্ঠান ও চার্চের অনাচারের বিরোধিতা : মার্টিন লুথার মনে করতেন যে খ্রিস্টধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের আত্মিক মুক্তি, নৈতিক জীবন এবং ঈশ্বরের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপন; কিন্তু মধ্যযুগের ক্যাথলিক চার্চে নানা ধরনের আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় রীতি এতটাই গুরুত্ব লাভ করেছিল যে সেগুলি অনেক সময় ধর্মের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করেছিল। তাই তিনি চার্চের এমন সব প্রথার সমালোচনা করেন, যেগুলি মানুষের ধর্মবিশ্বাসের পরিবর্তে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা ও অর্থনৈতিক লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। বিশেষত ইনডালজেন্স বা অর্থের বিনিময়ে পাপমোচনের ধারণাকে তিনি খ্রিস্টধর্মের মূল আদর্শের পরিপন্থী বলে মনে করেন। তিনি চার্চের অর্থলোলুপতা, পাদরিদের অনৈতিকতা এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সরব হন। ক্যাথলিক চার্চের প্রচলিত সাতটি স্যাক্রামেন্টের পরিবর্তে লুথার বাইবেলসম্মতভাবে বাপ্তিস্ম (Baptism) এবং ইউখারিস্ট বা প্রভুর ভোজ (Eucharist)-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি পাদরিদের একচ্ছত্র মধ্যস্থতাকারী ভূমিকারও সমালোচনা করেন এবং বিশ্বাসীদের আধ্যাত্মিক মর্যাদার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য প্রত্যেক বিশ্বাসীর ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও বাইবেল পাঠের অধিকার থাকা উচিত। এই ধারণা থেকেই পরবর্তীকালে ‘প্রিস্টহুড অব অল বিলিভার্স’ বা সকল বিশ্বাসীর আধ্যাত্মিক মর্যাদার ধারণা শক্তিশালী হয়। লুথারের এই আন্দোলন চার্চের ধর্মীয় কর্তৃত্বের পাশাপাশি তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ওপরও আঘাত হানে। ফলে সাধারণ মানুষ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং বহু জার্মান রাজকুমার তাঁর সংস্কারমূলক বক্তব্যের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ক্যাথলিক চার্চের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে নতুন শক্তির উত্থান ঘটে।
৪. প্রতিবাদী বা প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টধর্মের প্রতিষ্ঠা : লুথারের ধর্মসংস্কার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল খ্রিস্টান সমাজের মধ্যে বিভাজন এবং নতুন প্রোটেস্টান্ট (Protestant) ধর্মীয় ধারার প্রতিষ্ঠা। প্রথমদিকে লুথারের উদ্দেশ্য ছিল ক্যাথলিক চার্চের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও ধর্মীয় অনাচারের সংস্কার সাধন এবং খ্রিস্টধর্মের মূল আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করা। কিন্তু পোপ ও চার্চ কর্তৃপক্ষ তাঁর মতামত গ্রহণ না করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিরোধ ক্রমশ তীব্র হয়। ১৫২০ খ্রিস্টাব্দে পোপ লিও দশম লুথারের মতবাদ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলে তিনি তা অস্বীকার করেন এবং পোপের ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানান। ১৫২১ খ্রিস্টাব্দে ডায়েট অব ওয়ার্মস (Diet of Worms)-এও তাঁকে তাঁর মতামত প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি নিজের বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। এর ফলে তিনি রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং তাঁর অনুসারীরা পৃথক ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে সংগঠিত হতে শুরু করেন। পোপের অনুগামীদের ক্যাথলিক এবং লুথার ও তাঁর অনুসারীদের প্রোটেস্টান্ট বা প্রতিবাদী নামে অভিহিত করা হয়। এই বিভাজন কেবল ধর্মীয় ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সঙ্গে ইউরোপের রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসও যুক্ত হয়ে পড়ে। বহু জার্মান রাজকুমার পোপের কর্তৃত্ব থেকে নিজেদের অঞ্চলকে মুক্ত করার জন্য লুথারের মতবাদকে সমর্থন করেন। ফলে জার্মানিতে লুথারবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীকালে ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চল, বিশেষত উত্তর ইউরোপেও এর প্রভাব বিস্তার লাভ করে। এইভাবে লুথারের ব্যক্তিগত ধর্মীয় প্রতিবাদ একটি স্বতন্ত্র খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ের জন্ম দেয় এবং পশ্চিম ইউরোপের ধর্মীয় ঐক্যের অবসান ঘটিয়ে বহুধর্মীয় খ্রিস্টীয় পরিবেশের সূচনা করে।
৫. রাষ্ট্রশক্তির সুদৃঢ়করণ ও জাতীয় রাষ্ট্রের বিকাশ : ধর্মসংস্কার আন্দোলনে মার্টিন লুথারের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল ধর্মীয় কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে পোপের প্রাধান্য হ্রাস করে রাষ্ট্রশক্তি ও জাতীয় শাসকদের ভূমিকা শক্তিশালী করা। লুথারের মতে, সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষা, অন্যায়ের প্রতিকার এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পার্থিব শাসকের। ধর্মীয় ক্ষেত্রে পোপের সর্বময় কর্তৃত্বকে তিনি স্বীকার করেননি। তাঁর মতে, ঈশ্বরের বিধান অনুসারে পার্থিব শাসকরাও সমাজে নির্দিষ্ট কর্তৃত্বের অধিকারী। বিশেষত জার্মানির রাজকুমার ও শাসকেরা লুথারের আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন, কারণ এর মাধ্যমে তাঁরা রোমের পোপতন্ত্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে নিজেদের অঞ্চলকে মুক্ত করার সুযোগ পেয়েছিলেন। লুথারের বক্তব্যে ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও পার্থিব রাষ্ট্রক্ষমতার পৃথক ক্ষেত্রের ধারণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর ফলে জার্মানির বহু অঞ্চলে রাজকুমারদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং চার্চের সম্পত্তি ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। তাঁর মতবাদ জাতীয় ভাষা, জাতীয় চার্চ এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিকাশেও সহায়তা করে। যদিও লুথার সরাসরি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় রাষ্ট্রের তত্ত্ব প্রদান করেননি, তবুও তাঁর পোপবিরোধী অবস্থান এবং স্থানীয় শাসকদের সমর্থন ইউরোপে কেন্দ্রীভূত পোপতান্ত্রিক কর্তৃত্বের পরিবর্তে আঞ্চলিক রাষ্ট্রশক্তির উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই কারণে ধর্মসংস্কার আন্দোলন শুধু ধর্মীয় সংস্কার নয়, ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
৬. বাইবেল অনুবাদ ও ধর্মীয় জ্ঞান সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রসার : লুথারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান ছিল সাধারণ মানুষের কাছে বাইবেলকে পৌঁছে দেওয়া এবং ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে পুরোহিতদের একচেটিয়া কর্তৃত্বকে দুর্বল করা। মধ্যযুগে বাইবেল প্রধানত ল্যাটিন ভাষায় প্রচলিত ছিল এবং সাধারণ মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজের ভাষায় ধর্মগ্রন্থ পড়ার সুযোগ পেত না। ফলে ধর্মীয় সত্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান অনেকাংশে যাজকদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল ছিল। লুথার মনে করতেন, প্রত্যেক বিশ্বাসীর নিজের ধর্মগ্রন্থ পড়ে তার অর্থ বোঝার অধিকার থাকা উচিত। তাই তিনি নতুন নিয়ম (New Testament)-এর জার্মান অনুবাদ করেন এবং পরবর্তীকালে সমগ্র বাইবেলের জার্মান অনুবাদ সম্পূর্ণ করেন। তাঁর অনুবাদ সহজবোধ্য জার্মান ভাষায় হওয়ায় সাধারণ মানুষ তা পড়তে ও বুঝতে সক্ষম হয়। মুদ্রণযন্ত্রের সাহায্যে এই অনুবাদ দ্রুত বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এর ফলে ধর্মীয় জ্ঞান আর কেবল পোপ, পাদরি বা শিক্ষিত যাজকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে বাইবেল পাঠ, ধর্মীয় চিন্তা এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিকাশ ঘটে। একই সঙ্গে জার্মান ভাষার বিকাশ ও মান্যরূপ গঠনের ক্ষেত্রেও লুথারের বাইবেল অনুবাদ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাঁর এই উদ্যোগ শিক্ষার প্রসারেও সহায়তা করে, কারণ বাইবেল পড়ার জন্য মানুষকে পড়াশোনা শেখার প্রয়োজন অনুভূত হয়। এইভাবে লুথার ধর্মীয় জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে ধর্মীয় গণসচেতনতার বিকাশ ঘটান।
৭. লিখিত প্রচার, গ্রন্থ রচনা ও জনমত গঠন : লুথারের ধর্মসংস্কার আন্দোলন শুধু বক্তৃতা বা ব্যক্তিগত প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি অসংখ্য পুস্তিকা, প্রবন্ধ ও ধর্মতাত্ত্বিক গ্রন্থ রচনা করে তাঁর মতবাদকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। মুদ্রণযন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার তাঁর বক্তব্যকে দ্রুত জার্মানি ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে ‘Address to the Christian Nobility of the German Nation’, ‘The Babylonian Captivity of the Church’ এবং ‘The Freedom of a Christian’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘Address to the Christian Nobility’-তে তিনি জার্মান অভিজাত ও শাসকদের পোপতন্ত্রের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এবং জার্মানির ধর্মীয় বিষয়ে রোমের হস্তক্ষেপ কমানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ‘The Babylonian Captivity of the Church’-এ তিনি ক্যাথলিক চার্চের স্যাক্রামেন্ট ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের সমালোচনা করেন। অন্যদিকে ‘The Freedom of a Christian’-এ তিনি বিশ্বাস ও খ্রিস্টীয় স্বাধীনতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। এছাড়া তাঁর ‘The Bondage of the Will’ গ্রন্থে মানুষের ইচ্ছা, ঈশ্বরের সার্বভৌমত্ব এবং মুক্তির প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই সমস্ত রচনার মাধ্যমে লুথার ধর্মীয় প্রশ্নকে শিক্ষিত সমাজের বিতর্কের বিষয় করে তুলেছিলেন। তাঁর সহজ ভাষার পুস্তিকা ও প্রচারপত্র সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। ফলে চার্চের অনাচার ও পোপের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী জনমত গড়ে ওঠে। মুদ্রণযন্ত্রকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে ধর্মীয় সংস্কারের ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে লুথারের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। তাঁর প্রচারশক্তিই ধর্মসংস্কার আন্দোলনকে দ্রুত গণআন্দোলনের চরিত্র দিতে সাহায্য করেছিল।
৮. জার্মানি থেকে সমগ্র ইউরোপে ধর্মসংস্কার আন্দোলনের প্রসার ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব : মার্টিন লুথারের আন্দোলনের সর্বশেষ এবং বৃহত্তম অবদান ছিল জার্মানির সীমা অতিক্রম করে সমগ্র ইউরোপে ধর্মসংস্কারের নতুন পরিবেশ সৃষ্টি করা। ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর প্রতিবাদ মূলত ইনডালজেন্স প্রথার বিরুদ্ধে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা ক্যাথলিক চার্চের সামগ্রিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে পরিণত হয়। জার্মানির বিভিন্ন রাজকুমার, শহর ও সাধারণ মানুষের একাংশ লুথারের মতবাদ গ্রহণ করায় লুথারবাদ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। পরবর্তীকালে তাঁর আন্দোলনের প্রভাব সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে এবং ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলেও পৌঁছে যায়। যদিও ইংল্যান্ডের ধর্মসংস্কার মূলত রাজা অষ্টম হেনরির নেতৃত্বে পৃথক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয় এবং সুইজারল্যান্ডে জুইংলি ও ক্যালভিনের মতো সংস্কারক পৃথক মতবাদ বিকাশ করেন, তবুও লুথারের আন্দোলন সমগ্র ইউরোপে ক্যাথলিক চার্চের কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করার পথ খুলে দেয়। এর ফলে ইউরোপের ধর্মীয় ঐক্য ভেঙে যায় এবং ক্যাথলিক ও বিভিন্ন প্রোটেস্টান্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন ধর্মীয় বিভাজন তৈরি হয়। ধর্মসংস্কার আন্দোলনের ফলে শিক্ষা, মুদ্রণ, ভাষা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, রাষ্ট্রক্ষমতা এবং সামাজিক চিন্তার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটে। লুথারের আন্দোলন সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিবেক ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেওয়ায় ব্যক্তি ও ধর্মের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়। তবে তাঁর আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাও ছিল। কৃষক বিদ্রোহের সময় তিনি সামাজিক বিপ্লবের পরিবর্তে রাজকুমারদের কর্তৃত্বকে সমর্থন করেছিলেন এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান অনেক সময় রক্ষণশীল ছিল। তবুও ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে তাঁর সাহসী প্রতিবাদ ইউরোপীয় ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে।
উপসংহার : মার্টিন লুথারের ধর্মসংস্কার আন্দোলনের গুরুত্ব কেবল ক্যাথলিক চার্চের কয়েকটি অনাচারের প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ব্যক্তির বিবেক, বাইবেল পাঠ এবং ঈশ্বরের প্রতি প্রত্যক্ষ বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেন; পোপতন্ত্র ও ইনডালজেন্স প্রথার বিরোধিতা করেন; বাইবেলের অনুবাদের মাধ্যমে ধর্মীয় জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন এবং তাঁর লিখিত প্রচারের মাধ্যমে প্রোটেস্টান্ট ধর্মীয় আন্দোলনকে সুসংগঠিত করেন। একই সঙ্গে তাঁর মতবাদ জার্মান রাজকুমারদের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় রাষ্ট্রের বিকাশেও সহায়তা করে। তাই ষোড়শ শতকের ইউরোপীয় ধর্মসংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে মার্টিন লুথার নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর আন্দোলন মধ্যযুগীয় ধর্মীয় কর্তৃত্বের সংকটকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে এবং আধুনিক ইউরোপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি নির্মাণ করে।
Unit: 2- সপ্তদশ শতাব্দীর সংকট, ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লব এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব থেকে শিল্পবিপ্লব, ইউরোপে শিল্পসমাজের উত্থান, রূপান্তর-বিতর্ক, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং নতুন উদারপন্থী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্ম।
*****2) প্রশ্ন. আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণ গুলি কি কি ছিল? এই যুদ্ধে তাৎপর্য বর্ণনা কর। (১০) অথবা, আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামের বা যুদ্ধের কারণ/পটভূমি ও ফলাফল বা গুরুত্ব আলোচনা কর। (৫+৫)
ভূমিকা : অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে উত্তর আমেরিকার তেরোটি ব্রিটিশ উপনিবেশের সঙ্গে মাতৃদেশ ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিরোধ ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। উপনিবেশবাসীরা প্রথমদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থেকেই নিজেদের অধিকার রক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের একের পর এক করনীতি, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ, প্রতিনিধিত্বহীন শাসন এবং দমনমূলক ব্যবস্থা উপনিবেশবাসীদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে। শেষপর্যন্ত এই বিরোধ স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তরিত হয় এবং ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে সশস্ত্র সংঘর্ষ শুরু হয়। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হয় এবং দীর্ঘ যুদ্ধের শেষে ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দের প্যারিসের সন্ধির মাধ্যমে ব্রিটেন আমেরিকার স্বাধীনতা স্বীকার করে। এই বিপ্লব শুধু একটি উপনিবেশের স্বাধীনতা অর্জনের ঘটনা ছিল না; এটি গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র, জনগণের অধিকার ও জাতীয় স্বাধীনতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।
১. জাতীয়তাবাদী চেতনা ও স্বাতন্ত্র্যবোধ : আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি ছিল উপনিবেশবাসীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান স্বাতন্ত্র্যবোধ ও জাতীয়তাবাদী চেতনা। উত্তর আমেরিকার তেরোটি উপনিবেশ ভৌগোলিকভাবে ইংল্যান্ড থেকে প্রায় তিন হাজার মাইল দূরে অবস্থিত ছিল। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকায় বসবাস করার ফলে উপনিবেশবাসীদের জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সামাজিক পরিবেশ ইংল্যান্ডের তুলনায় অনেকটাই পৃথক হয়ে উঠেছিল। নতুন মহাদেশে বসবাসকারী মানুষ নিজেদের স্বার্থ ও অধিকার সম্পর্কে ক্রমশ সচেতন হয়ে ওঠে। স্থানীয় আইনসভা ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তারা অনেকাংশে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয় পরিচালনা করত। ফলে দূরবর্তী ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট তাদের উপর কর ও আইন চাপিয়ে দিলে তা স্বাভাবিকভাবেই তাদের কাছে অন্যায় বলে মনে হয়। উপনিবেশবাসীরা মনে করতে শুরু করে যে ইংল্যান্ডের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়, বরং পারস্পরিক অধিকারের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। উপরন্তু, আমেরিকায় স্বাধীন চিন্তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। জন লক, টমাস পেইন প্রমুখ চিন্তাবিদদের রাজনৈতিক ধারণা জনগণের মধ্যে স্বাধীনতা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। ফলে ব্রিটিশ শাসনের অধীন থেকেও নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই জাতীয়তাবাদী চেতনা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দাবিকে জনপ্রিয় করে তোলে।
২. অর্থনৈতিক শোষণ ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ : আমেরিকার বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক নীতি। ব্রিটিশ সরকার আমেরিকান উপনিবেশগুলিকে মূলত কাঁচামালের উৎস এবং ব্রিটিশ শিল্পজাত পণ্যের বাজার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইত। Navigation Acts-এর মাধ্যমে উপনিবেশগুলির বৈদেশিক বাণিজ্যের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। উপনিবেশবাসীরা ব্রিটেনের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশের সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করতে পারত না এবং বহু ক্ষেত্রে ব্রিটিশ জাহাজ ব্যবহার করতে বাধ্য ছিল। উপনিবেশগুলিতে এমন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রেও বাধা দেওয়া হয়েছিল, যা ব্রিটিশ শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারত। ফলে আমেরিকার বণিক ও শিল্পোদ্যোগীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্রিটিশ বাণিজ্যনীতির ফলে আমেরিকান উপনিবেশগুলির অর্থনৈতিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, অথচ তাদের কাছ থেকেই ব্রিটিশ সরকার রাজস্ব আদায় করছিল। সপ্তবর্ষের যুদ্ধের পর ব্রিটেন বিপুল ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে পড়লে উপনিবেশগুলির উপর আরও বেশি আর্থিক বোঝা চাপানোর চেষ্টা করা হয়। উপনিবেশবাসীরা বুঝতে পারে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্যই তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই অর্থনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বাণিজ্যিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বাধীনতা এবং নিজেদের অর্থনৈতিক সম্পদের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা বিপ্লবকে আরও তীব্র করে তোলে।
৩. করনীতি ও ‘No Taxation without Representation’ : ব্রিটিশ সরকারের করনীতি ছিল আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণগুলির মধ্যে অন্যতম। সপ্তবর্ষের যুদ্ধের ফলে ব্রিটিশ সরকারের বিপুল ঋণ সৃষ্টি হয়েছিল। এই ঋণের বোঝা কমানোর জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জর্জ গ্রেনভিলের সরকার আমেরিকার উপনিবেশগুলির উপর নতুন কর আরোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে Sugar Act এবং ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে Stamp Act প্রবর্তন করা হয়। Stamp Act-এর মাধ্যমে সংবাদপত্র, দলিল, চুক্তিপত্র, আইনগত নথি প্রভৃতির উপর কর ধার্য করা হয়। পরবর্তীকালে Townshend Acts-এর মাধ্যমে কাচ, কাগজ, রং, সীসা ও চায়ের মতো পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করা হয়। উপনিবেশবাসীরা প্রশ্ন তোলে—যে পার্লামেন্টে তাদের কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই, সেই পার্লামেন্ট কীভাবে তাদের উপর কর আরোপ করতে পারে? এখান থেকেই বিখ্যাত স্লোগান “No taxation without representation” বা “প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয়”-এর জন্ম হয়। উপনিবেশবাসীরা কর প্রদানকে কেবল অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখেনি; তারা এটিকে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে দেখেছিল। তাদের মতে, কর আরোপের অধিকার কেবল সেই প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানটির থাকা উচিত যেখানে জনগণের প্রতিনিধি উপস্থিত রয়েছে। ফলে করবিরোধী আন্দোলন দ্রুত গণআন্দোলনে পরিণত হয়। ব্রিটিশ সরকার কর প্রত্যাহার করলেও তার আইন প্রণয়নের অধিকার বজায় রাখে, ফলে বিরোধ আরও তীব্র হয় এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রামের পথ প্রশস্ত হয়।
৪. বোস্টন টি পার্টি ও দমনমূলক আইন : ব্রিটিশ সরকারের করনীতি ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে উপনিবেশবাসীদের প্রতিবাদ ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে চরম আকার ধারণ করে। ব্রিটিশ সরকার East India Company-কে আমেরিকায় চা বিক্রির বিশেষ সুবিধা দিলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হয়। উপনিবেশবাসীরা মনে করেছিল, এই ব্যবস্থা ব্রিটিশ বাণিজ্যিক একচেটিয়াতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে। ১৭৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বোস্টন বন্দরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। কয়েকজন উপনিবেশবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের পোশাক ধারণ করে ব্রিটিশ জাহাজে উঠে প্রায় ৩৪২ বাক্স চা সমুদ্রে ফেলে দেয়। এই ঘটনা ইতিহাসে Boston Tea Party নামে পরিচিত। এর প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশ সরকার কঠোর দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বোস্টন বন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং Massachusetts-সহ উপনিবেশগুলির উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ব্রিটিশ সৈন্যদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পায় এবং উপনিবেশবাসীদের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হয়। কিন্তু দমননীতি আন্দোলনকে থামাতে পারেনি; বরং তেরোটি উপনিবেশের মধ্যে ঐক্য বৃদ্ধি করে। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে First Continental Congress-এর অধিবেশন বসে এবং উপনিবেশগুলি সম্মিলিতভাবে ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। এর ফলে বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ একটি সর্বজনীন স্বাধীনতা আন্দোলনে পরিণত হয়।
৫. স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্ব : ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে বিরোধ শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র যুদ্ধে রূপ নেয়। ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে Lexington ও Concord-এর সংঘর্ষের মাধ্যমে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হয়। একই বছর Second Continental Congress জর্জ ওয়াশিংটনকে Continental Army-এর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করে। ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান কৃতিত্ব ছিল বিভিন্ন উপনিবেশের বিচ্ছিন্ন ও অনভিজ্ঞ সৈন্যদের একটি সংগঠিত বাহিনীতে পরিণত করা। তাঁর নেতৃত্ব, ধৈর্য ও সামরিক কৌশল আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই Thomas Jefferson-এর প্রধান ভূমিকার মাধ্যমে প্রস্তুত Declaration of Independence গৃহীত হয়। এতে ঘোষণা করা হয় যে সব মানুষ সমান এবং মানুষের কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার রয়েছে—যেমন জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের সন্ধান। সরকারের বৈধতা জনগণের সম্মতির উপর নির্ভর করে—এই ধারণাও ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র যুদ্ধকে একটি সুস্পষ্ট আদর্শগত ভিত্তি প্রদান করে। পরবর্তীকালে ফ্রান্স আমেরিকানদের সাহায্যে এগিয়ে আসে এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ব্রিটেন পরাজিত হয় এবং ১৭৮৩ সালের প্যারিসের সন্ধির মাধ্যমে আমেরিকার স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে জর্জ ওয়াশিংটন স্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং নতুন প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন।
৬. রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক তাৎপর্য : আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য ছিল রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ক্ষেত্রে। এই বিপ্লব প্রমাণ করেছিল যে জনগণ অন্যায় ও প্রতিনিধিত্বহীন শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ব্রিটিশ রাজতান্ত্রিক কর্তৃত্বের পরিবর্তে আমেরিকায় প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন সংবিধান প্রণীত হওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতার বিভাজন, সাংবিধানিক সরকার এবং আইনের শাসনের ধারণা শক্তিশালী হয়। রাষ্ট্রপতি, কংগ্রেস ও সুপ্রিম কোর্টের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন স্বৈরতন্ত্রের পরিবর্তে সাংবিধানিক শাসনের একটি নতুন আদর্শ তৈরি করে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ‘মানুষের অধিকার’ ও ‘জনগণের সম্মতি’-র ধারণা পরবর্তী বিশ্বের রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তবে একথাও মনে রাখতে হবে যে স্বাধীনতার সময় আমেরিকার গণতন্ত্র সম্পূর্ণ সর্বজনীন ছিল না; নারী, দাস এবং বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠী সমান রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। তবুও জনগণের অধিকার, স্বাধীনতা এবং প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের যে আদর্শ আমেরিকান বিপ্লব সামনে নিয়ে আসে, তা পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৭. সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক তাৎপর্য : আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রভাব শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও ছিল সুদূরপ্রসারী। ব্রিটিশ বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হওয়ার ফলে আমেরিকানরা নিজেদের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের সুযোগ পায়। শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশের পথ কিছুটা উন্মুক্ত হয় এবং নতুন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী হতে থাকে। সামাজিক ক্ষেত্রেও বংশগত অভিজাততন্ত্রের প্রভাব দুর্বল হয় এবং ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও নাগরিকত্বের ধারণা গুরুত্ব পায়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমেরিকার সাফল্য ইউরোপীয় শক্তিগুলির উপরও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ফ্রান্স আমেরিকাকে সাহায্য করার ফলে ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়। আমেরিকার বিজয় ফরাসি জনগণের মধ্যে স্বাধীনতা, সাম্য ও জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণাকে উৎসাহিত করে। পরবর্তীকালে ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লবের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে আমেরিকার অভিজ্ঞতার প্রভাব লক্ষ করা যায়। একইভাবে লাতিন আমেরিকার উপনিবেশগুলির মধ্যেও পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ আমেরিকার বিপ্লব দেখিয়ে দেয় যে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে একটি উপনিবেশও সফলভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে। এই কারণে এটি পরবর্তী উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
৮. উপনিবেশবাদ ও বিশ্ব ইতিহাসে প্রভাব : আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ বিশ্ব ইতিহাসে আধুনিক উপনিবেশবিরোধী যুগের সূচনার ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিটেনের মতো শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রকে পরাজিত করে তেরোটি উপনিবেশ স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ফলে ইউরোপীয় উপনিবেশগুলির জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জন্মায়। স্বাধীনতা যে কেবল একটি কল্পনা নয়, বাস্তবে অর্জনযোগ্য—আমেরিকার বিপ্লব তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেয়। এর ফলে জনগণের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার, প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ও প্রজাতন্ত্রের ধারণা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চিন্তায় বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। ইউরোপের পুরোনো রাজতান্ত্রিক ও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উদীয়মান নতুন রাজনৈতিক চিন্তাধারা আমেরিকার অভিজ্ঞতা থেকে শক্তি পায়। ফরাসি বিপ্লবের সময় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে আমেরিকান অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে উনিশ ও বিংশ শতকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলিও আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করে। যদিও আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ছিল এবং দাসপ্রথা দীর্ঘদিন বজায় ছিল, তবুও স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকারের যে রাজনৈতিক আদর্শ এটি বিশ্ববাসীর সামনে প্রতিষ্ঠা করে, তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
উপসংহার : আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবির সম্মিলিত ফল। ব্রিটিশ বাণিজ্যিক শোষণ, প্রতিনিধিত্বহীন করনীতি, Navigation Acts, Stamp Act, Townshend Acts, Boston Tea Party এবং ব্রিটিশ দমননীতি এই বিপ্লবের তাৎক্ষণিক ও প্রত্যক্ষ কারণ হলেও এর গভীরে ছিল স্বাধীনতা ও স্বশাসনের আকাঙ্ক্ষা। জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্ব, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আদর্শ এবং ফ্রান্সের সহযোগিতা আমেরিকার বিজয়কে সম্ভব করে তোলে। ১৭৮৩ সালের প্যারিসের সন্ধির মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাই আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ কেবল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একটি উপনিবেশের বিজয় নয়; এটি ছিল স্বাধীনতা, জনগণের অধিকার, সাংবিধানিক শাসন ও প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের এক ঐতিহাসিক বিজয়, যার প্রভাব পরবর্তী বিশ্ব ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠেছিল।
Unit: 3- ফরাসি বিপ্লবের ব্যাখ্যা, দার্শনিকগণ ও আদর্শগত পটভূমি, ভিয়েনা মীমাংসা ও মেটারনিখ ব্যবস্থা, জার্মানি ও ইতালিতে জাতিরাষ্ট্রের জন্ম, নেপোলিয়নীয় যুগ, ১৮৩০ ও ১৮৪৮ সালের বিপ্লব এবং ইউরোপে কার্ল মার্ক্স ও সমাজতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ।
*****3) প্রশ্ন. ১৮৩০ এর জুলাই বিপ্লবের কারণগুলি আলোচনা করো। এই বিপ্লব কি অবধারিত ছিল? (১০)
ভূমিকা: ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লব ছিল উনিশ শতকের ইউরোপীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়নের পতনের পর ভিয়েনা সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফ্রান্সে বুরবোঁ রাজবংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় এবং অষ্টাদশ লুই সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ফরাসি বিপ্লবের কিছু আদর্শের সঙ্গে রাজতন্ত্রের সমন্বয় করার চেষ্টা করলেও তাঁর পরবর্তী শাসক দশম চার্লস সম্পূর্ণ বিপরীত পথে অগ্রসর হন। তাঁর প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বৈরাচারী নীতি, অভিজাত ও যাজকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ এবং ভোটাধিকার সংকোচন ফরাসি জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত ২৬ জুলাই ১৮৩০-এর অর্ডিন্যান্সকে কেন্দ্র করে প্যারিসে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং মাত্র তিন দিনের মধ্যে দশম চার্লস সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই ঘটনাই ইতিহাসে ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত। তবে এই বিপ্লবের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ যেমন ছিল, তেমনি এর অনিবার্যতা নিয়েও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
১. বুরবোঁ রাজবংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার দ্বন্দ্ব: নেপোলিয়নের পতনের পর ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে বুরবোঁ রাজবংশ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভিয়েনা সম্মেলনের ‘ন্যায্য অধিকার’ নীতির ভিত্তিতে অষ্টাদশ লুই ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন। তাঁর সঙ্গে ফ্রান্সে ফিরে আসে বিপ্লব ও নেপোলিয়নের সময় দেশত্যাগী বহু অভিজাত ও যাজক। এঁরা বিপ্লবের সময় হারানো জমি, সম্পত্তি ও সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু ১৭৮৯-এর ফরাসি বিপ্লবের ফলে ফরাসি সমাজে স্বাধীনতা, সাম্য, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক শাসনের যে আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা আর সহজে মুছে ফেলা সম্ভব ছিল না। ফলে একদিকে পুরাতন রাজতন্ত্র ও অভিজাতদের স্বার্থ, অন্যদিকে বিপ্লব-উত্তর সমাজের উদারনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ক্রমাগত সংঘাত দেখা দেয়। এই দ্বন্দ্বই জুলাই বিপ্লবের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি তৈরি করে। ঐতিহাসিক হ্যাভেলের মতে, ফ্রান্সে উগ্র রাজতন্ত্রী ও উদারনৈতিক শক্তির আদর্শগত সংঘাতই শেষ পর্যন্ত ১৮৩০-এর জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২. অষ্টাদশ লুই-এর সমন্বয় নীতির ব্যর্থতা: অষ্টাদশ লুই বুঝতে পেরেছিলেন যে ফরাসি বিপ্লবের সমস্ত পরিবর্তনকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে পুরাতন রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই তিনি একদিকে বুরবোঁ রাজতন্ত্র বজায় রেখে অন্যদিকে বিপ্লবের কিছু উদারনৈতিক আদর্শকে স্বীকার করার চেষ্টা করেন। ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের সনদের মাধ্যমে তিনি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন এবং নাগরিকদের কিছু অধিকার স্বীকার করেন। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠিত হয় এবং সীমিত ভোটাধিকারের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু এই সমন্বয় নীতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একদিকে উগ্র রাজতন্ত্রীরা রাজার ক্ষমতা আরও বাড়াতে চাইছিল, অন্যদিকে উদারপন্থীরা অধিক রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব দাবি করছিল। ফলে অষ্টাদশ লুই-এর মধ্যপন্থী নীতি দুই পক্ষকেই সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুর পর এই ভারসাম্য আরও ভেঙে পড়ে এবং দশম চার্লস উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল নীতি গ্রহণ করেন। ফলে বিপ্লবী ও উদারনৈতিক শক্তির সঙ্গে রাজতন্ত্রের সংঘাত তীব্রতর হয়ে জুলাই বিপ্লবের পরিস্থিতি তৈরি করে।
৩. বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সংঘর্ষ ও উদারনীতির বিকাশ: বুরবোঁ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ফ্রান্সে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। উগ্র রাজতন্ত্রীরা বিপ্লব-পূর্ব সমাজব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল; উদারপন্থীরা সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিল; প্রজাতন্ত্রবাদীরা আরও দূরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে ছিল এবং বোনাপার্টপন্থীরাও নেপোলিয়নের ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহী ছিল। ফলে ফরাসি রাজনীতি ক্রমশ বিভক্ত হয়ে পড়ে। সংবাদপত্র, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী মহলও উদারনৈতিক চিন্তার প্রচার করতে থাকে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিশেষভাবে সাংবিধানিক অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া শ্রেণির অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পেলেও রাজনৈতিক ক্ষমতায় তাদের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। ফলে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এই শ্রেণি রাজনৈতিক অধিকার সম্প্রসারণের দাবি জানাতে থাকে। এই উদারনৈতিক ও সাংবিধানিক চেতনা দশম চার্লসের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
৪. শ্বেত সন্ত্রাস ও উগ্র রাজতন্ত্রীদের প্রভাব বৃদ্ধি: ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়নের ‘শত দিবসের শাসন’-এর পর বুরবোঁ রাজতন্ত্র পুনরায় ক্ষমতায় এলে ফ্রান্সে ‘শ্বেত সন্ত্রাস’-এর সূচনা হয়। উগ্র রাজতন্ত্রীরা নেপোলিয়নের সমর্থক, প্রজাতন্ত্রী এবং উদারপন্থীদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে শুরু করে। বহু মানুষকে হত্যা, কারাবন্দি ও নির্যাতন করা হয়। এই ঘটনায় ফরাসি সমাজে ভয় ও অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। আইনসভায় উগ্র রাজতন্ত্রীরা শক্তিশালী হয়ে উঠলে তারা বিপ্লবের সময় গৃহীত সংস্কারগুলি প্রত্যাহার করার চেষ্টা করে। তারা অভিজাত ও যাজকদের বিশেষ অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিল। অষ্টাদশ লুই প্রথমদিকে তাদের চরমপন্থা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেও ধীরে ধীরে তিনি তাদের প্রভাবের অধীনে চলে যান। বিশেষত ডিউক দ্য বেরির হত্যাকাণ্ডের পর উগ্র রাজতন্ত্রীরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর ফলে ফ্রান্সের উদারপন্থী ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আশঙ্কা দেখা দেয় যে বুরবোঁ রাজতন্ত্র আবার বিপ্লব-পূর্ব স্বৈরাচারী সমাজব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চাইছে। এই আশঙ্কা জুলাই বিপ্লবের পটভূমিকে আরও দৃঢ় করে।
৫. দশম চার্লসের প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বৈরাচারী নীতি: ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে অষ্টাদশ লুই-এর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই দশম চার্লস ফ্রান্সের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন উগ্র রাজতন্ত্রবাদী এবং ফরাসি বিপ্লবের আদর্শের প্রবল বিরোধী। তিনি মনে করতেন রাজা ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার নিয়ে শাসন করেন এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার রাজার ক্ষমতার উপর প্রাধান্য পেতে পারে না। তিনি অভিজাত ও যাজক শ্রেণিকে পুনরায় শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন। বিপ্লবের সময় ক্ষতিগ্রস্ত অভিজাতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হয়। যাজকদের শিক্ষাক্ষেত্রে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তাঁর মন্ত্রিসভাও উদারপন্থীদের পরিবর্তে প্রতিক্রিয়াশীলদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে পলিনিয়াক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর রাজতন্ত্রের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি যখন রাজনৈতিক অধিকার বাড়ানোর দাবি করছিল, তখন চার্লস উল্টো রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত করতে থাকেন। ফলে রাজতন্ত্র ও জনগণের মধ্যে সংঘাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাঁর এই অনমনীয় নীতি জুলাই বিপ্লবকে প্রায় অবশ্যম্ভাবী সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়।
৬. জুলাই অর্ডিন্যান্স ও প্রত্যক্ষ কারণ: জুলাই বিপ্লবের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই দশম চার্লসের জারি করা চারটি অর্ডিন্যান্স। ১৮৩০-এর নির্বাচনে উদারপন্থীরা শক্তিশালী হয়ে উঠলে চার্লস ও তাঁর প্রধানমন্ত্রী পলিনিয়াক সংসদীয় বিরোধিতাকে অগ্রাহ্য করে এই অর্ডিন্যান্স জারি করেন। এর মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কার্যত বন্ধ করা হয়, সদ্য নির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয়, নির্বাচনী আইন পরিবর্তন করে ভোটাধিকার আরও সংকুচিত করা হয় এবং নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। এই পদক্ষেপকে ফরাসি জনগণ সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের উপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে গ্রহণ করে। প্যারিসের সাংবাদিক, ছাত্র, শ্রমিক, কারিগর এবং সাধারণ নাগরিকরা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। ২৭, ২৮ ও ২৯ জুলাই প্যারিসে ব্যারিকেড তৈরি করে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। তিন দিনের এই ঘটনাকে ‘তিন গৌরবময় দিন’ বলা হয়। শেষ পর্যন্ত রাজতন্ত্রের প্রতি সেনাবাহিনীর সমর্থন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দশম চার্লস দেশত্যাগে বাধ্য হন। এরপর অরলেয়াঁর ডিউক লুই ফিলিপ ‘ফরাসিদের রাজা’ হিসেবে সিংহাসনে বসেন। তাই জুলাই অর্ডিন্যান্স ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ।
৭. জুলাই বিপ্লব কি অনিবার্য ছিল—অনিবার্য ছিল না এমন মত: জুলাই বিপ্লব অনিবার্য ছিল কি না, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ডেভিড টমসন, জ্যাক ড্রোজ ও কোবান প্রমুখ ঐতিহাসিকের মতে, বিপ্লব অনিবার্য ছিল না। তাঁদের যুক্তি হল, অষ্টাদশ লুই তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত মধ্যপন্থী নীতি বজায় রাখতে পারলে এবং দশম চার্লস তাঁর ভাইয়ের নীতি অনুসরণ করলে সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব ছিল। ১৮১৪-এর সনদের মাধ্যমে রাজতন্ত্র ও বিপ্লব-উত্তর পরিবর্তনের মধ্যে যে সমঝোতা তৈরি হয়েছিল, তা আরও কিছুদিন বজায় থাকলে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র টিকে যেতে পারত। দশম চার্লস যদি উদারপন্থী আইনসভার সঙ্গে সহযোগিতা করতেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হঠাৎ কেড়ে না নিতেন এবং ভোটাধিকার সংকুচিত না করতেন, তাহলে জনগণের মধ্যে এত তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হত না। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী জুলাই বিপ্লব ছিল মূলত দশম চার্লসের রাজনৈতিক হঠকারিতা ও ভুল সিদ্ধান্তের ফল। অর্থাৎ সঠিক সময়ে সমঝোতা ও মধ্যপন্থা গ্রহণ করা হলে বিপ্লব এড়ানো সম্ভব ছিল। তাই এই ঐতিহাসিকদের মতে জুলাই বিপ্লব ঐতিহাসিকভাবে অনিবার্য ছিল না।
৮. জুলাই বিপ্লব কি অনিবার্য ছিল—অনিবার্য ছিল এমন মত ও মূল্যায়ন: অন্যদিকে উদারপন্থী ঐতিহাসিকদের মতে, জুলাই বিপ্লবের গভীরে যে সাংবিধানিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব ছিল, তা শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটাত। বুরবোঁ রাজতন্ত্রের ঈশ্বরপ্রদত্ত রাজাধিকার ও ফরাসি বিপ্লবের স্বাধীনতা, সাম্য ও জনগণের সার্বভৌমত্বের আদর্শের মধ্যে মৌলিক বিরোধ ছিল। ১৮১৪-এর সনদেও প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা রাজার হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল; রাজা মন্ত্রী নিয়োগ ও বরখাস্ত করতে পারতেন এবং আইনসভা ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর ছিল। ভোটাধিকার ছিল অত্যন্ত সীমিত। ফলে রাজনৈতিকভাবে সচেতন মধ্যবিত্ত ও সাধারণ জনগণের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে রাজতান্ত্রিক কাঠামোর সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। অষ্টাদশ লুই-এর মধ্যপন্থা সাময়িকভাবে এই সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণ করলেও সমস্যার মূল কারণ দূর করতে পারেনি। দশম চার্লস সেই ভারসাম্য নষ্ট করে প্রতিক্রিয়াশীল নীতি গ্রহণ করায় সংকট দ্রুত বিস্ফোরিত হয়। তাই বলা যায়, জুলাই বিপ্লবের নির্দিষ্ট সময় ও রূপ অনিবার্য ছিল না, কিন্তু রাজতন্ত্র ও উদারনৈতিক সমাজের মৌলিক সংঘাতের কারণে কোনো না কোনো পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
উপসংহার: ১৮৩০-এর জুলাই বিপ্লব হঠাৎ সংঘটিত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। বুরবোঁ রাজবংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিপ্লবী আদর্শ ও প্রতিক্রিয়াশীলতার সংঘাত, অষ্টাদশ লুই-এর অসম্পূর্ণ সমন্বয়নীতি, উগ্র রাজতন্ত্রীদের উত্থান, দশম চার্লসের স্বৈরাচারী নীতি এবং সর্বশেষ জুলাই অর্ডিন্যান্স—সব মিলিয়ে বিপ্লবের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বিপ্লবের নির্দিষ্ট সময় ও রূপ এড়ানো সম্ভব ছিল, কিন্তু পুরাতন রাজতান্ত্রিক স্বৈরাচার ও নতুন উদারনৈতিক রাজনৈতিক চেতনার সংঘাত দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী রাখা কঠিন ছিল। তাই জুলাই বিপ্লবকে একদিকে দশম চার্লসের হঠকারিতার তাৎক্ষণিক ফল বলা যায়, অন্যদিকে ফরাসি সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও স্বাভাবিক পরিণতি বলা যায়। এই অর্থে বিপ্লবটি সম্পূর্ণ অনিবার্য না হলেও তার পেছনের ঐতিহাসিক সংঘাত ছিল গভীর ও অনিবার্য।
Unit: 4- ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের উৎস, নাৎসিবাদ ও ফ্যাসিবাদ, সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে বিশ্বযুদ্ধসমূহ, লিগ অব নেশনস থেকে জাতিসংঘ (UNO) পর্যন্ত, ১৯৪৫-পরবর্তী ঠান্ডা যুদ্ধ, বিভিন্ন সামরিক ও অর্থনৈতিক জোট, দ্বিমেরু বিশ্বের আঞ্চলিক সংঘাত—ভিয়েতনাম, কোরিয়া, কিউবা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তান, দেতঁ (Détente) এবং বিশ্বায়নের বিভিন্ন দিক।
*****4) প্রশ্ন. ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের পটভূমি আলোচনা কর। (৫) অথবা, ইতালিতে মুসোলিনির ক্ষমতায় উত্থান তুমি কিভাবে ব্যাখ্যা করবে? (৫)
ভূমিকা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ইতালিতেও গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট দেখা দেয়। যুদ্ধে বিজয়ী পক্ষের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ইতালি শান্তি-চুক্তিতে প্রত্যাশিত ভূখণ্ড ও মর্যাদা লাভ করতে না পারায় জাতীয় অপমানবোধ তীব্র হয়ে ওঠে। অন্যদিকে যুদ্ধোত্তর মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, খাদ্যাভাব, শ্রমিক ধর্মঘট, কৃষক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ইতালির জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। উদারতন্ত্রী সরকার এই সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদী আন্দোলনের প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং ধনী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে সাম্যবাদ-ভীতি সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে বেনিতো মুসোলিনি জাতীয়তাবাদ, শক্তিশালী রাষ্ট্র, শৃঙ্খলা ও সাম্যবাদ-বিরোধিতার আদর্শ সামনে রেখে ফ্যাসিস্ট আন্দোলনকে শক্তিশালী করেন। শেষ পর্যন্ত ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ‘March on Rome’-এর মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় আসেন। সুতরাং ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান ছিল যুদ্ধোত্তর সংকট, জাতীয় হতাশা, রাজনৈতিক দুর্বলতা, সাম্যবাদ-ভীতি এবং মুসোলিনির নেতৃত্বের সম্মিলিত ফল।
১) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব ও ‘বিকৃত বিজয়’-এর হতাশা: ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব। ইতালি প্রথমে নিরপেক্ষ থাকলেও ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয় এবং যুদ্ধের ফলে বিপুল প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা বহু সৈনিক কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশ হয়ে পড়ে এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কিন্তু ইতালীয়দের হতাশার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল যুদ্ধের পর প্রত্যাশিত ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক সুবিধা না পাওয়া। যুদ্ধের পূর্বে মিত্রশক্তির সঙ্গে লন্ডন চুক্তির মাধ্যমে ইতালিকে ট্রেন্টিনো, দক্ষিণ টাইরল, ট্রিয়েস্ট ও ইস্ট্রিয়া প্রভৃতি অঞ্চল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও যুদ্ধশেষে ইতালির সব দাবি পূরণ হয়নি। ফিউমে ও ডালমেশিয়া প্রশ্নেও ইতালীয় জাতীয়তাবাদীরা হতাশ হয়। প্যারিস শান্তি সম্মেলনে ইতালির প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় জাতীয়তাবাদী মহলে প্রবল ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং এই পরিস্থিতিকে ‘বিকৃত বিজয়’ বা Mutilated Victory বলা হয়। ইতালীয়দের ধারণা হয় যে, যুদ্ধ জয় করেও তারা প্রকৃত বিজয়ের সুফল লাভ করেনি। উদারতন্ত্রী সরকারকে তারা দুর্বল ও অযোগ্য বলে মনে করতে থাকে। এই জাতীয় অপমানবোধকে মুসোলিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগান। তিনি ঘোষণা করেন যে ইতালিকে আবার শক্তিশালী ও মর্যাদাশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে দুর্বল সংসদীয় রাজনীতির পরিবর্তে শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের প্রয়োজন। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরাজয় না হলেও ‘অপূর্ণ বিজয়’-এর মানসিকতা ফ্যাসিবাদের উত্থানের জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে।
২) অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়ে এবং এই অর্থনৈতিক সংকট ফ্যাসিবাদের উত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় সরকারের ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং মুদ্রাস্ফীতির ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা সৈনিকদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ফলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠে। শিল্পক্ষেত্রেও সংকট দেখা দেয়। যুদ্ধকালীন উৎপাদনের চাহিদা কমে যাওয়ায় বহু কারখানায় উৎপাদন হ্রাস পায় এবং শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। ধর্মঘট, বিক্ষোভ ও শ্রমিক আন্দোলন ক্রমশ ব্যাপক আকার ধারণ করে। রেল, ডাক, পরিবহন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও ধর্মঘটের প্রভাব পড়ে এবং দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক জীবন ব্যাহত হয়। গ্রামাঞ্চলেও কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। কৃষকেরা জমির অধিকারের দাবি তোলে এবং অনেক ক্ষেত্রে জমি দখল ও খাজনা বন্ধের আন্দোলনে অংশ নেয়। ১৯১৯-২০ সালের এই অস্থির সময়কে ইতালির ইতিহাসে ‘দুই লাল বছর’ বা Biennio Rosso বলা হয়। রুশ বিপ্লবের প্রভাবে শ্রমিকদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী চিন্তার বিস্তার ঘটে। কিন্তু শ্রমিক ও কৃষকদের আন্দোলন দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি। বরং শিল্পপতি, জমিদার, ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় যে ইতালিতেও রাশিয়ার মতো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক সংকট যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছিল, তেমনি সম্পত্তিশালী শ্রেণির মধ্যে সাম্যবাদ-বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করে ফ্যাসিস্টদের সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী করেছিল।
৩) উদারতন্ত্রী সরকারের ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা: ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল উদারতন্ত্রী সরকারের রাজনৈতিক অক্ষমতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই ইতালির সংসদীয় ব্যবস্থা নানা দুর্বলতায় আক্রান্ত ছিল। যুদ্ধের পর সেই দুর্বলতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। উদারতন্ত্রী সরকার অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক অসন্তোষ এবং জাতীয়তাবাদী ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতবিরোধ ও দলাদলি বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থায়ী ও শক্তিশালী সরকার গঠন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯১৯ সালের নির্বাচনে সমাজতন্ত্রী ও ক্যাথলিক পপুলার পার্টি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে এবং উদারতন্ত্রীদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে যায়। ১৯১৯ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে ইতালিতে একাধিক মন্ত্রিসভার পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু কোনো সরকারই দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সরকারের এই দুর্বলতা সাধারণ মানুষের মধ্যে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়। তারা মনে করতে শুরু করে যে বিতর্ক, দলাদলি ও নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে দেশের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বরং একজন শক্তিশালী নেতা প্রয়োজন, যিনি কঠোর হাতে আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। এই পরিস্থিতিতে মুসোলিনি নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেন যিনি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দূর করে ইতালিতে শৃঙ্খলা ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। উদারতন্ত্রী সরকার ফ্যাসিস্টদের হিংসাত্মক কার্যকলাপও কার্যকরভাবে দমন করতে পারেনি। ফলে ফ্যাসিস্টরা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শেষপর্যন্ত রাজা ভিক্টর ইমানুয়েল তৃতীয়ও মুসোলিনিকে সরকারের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অতএব, উদারতন্ত্রী সরকারের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ফ্যাসিবাদের ক্ষমতায় আসার পথ অনেকটাই প্রশস্ত করেছিল।
৪) সাম্যবাদ-ভীতি, সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতা ও ফ্যাসিস্টদের সামাজিক সমর্থন: রাশিয়ার ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব ইতালির রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ইতালির সমাজতন্ত্রী ও শ্রমিক সংগঠনগুলির মধ্যে রুশ বিপ্লবের আদর্শ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং শ্রমিকেরা ধর্মঘট, কারখানা দখল ও উৎপাদন ব্যবস্থায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। কৃষকরাও জমির অধিকারের জন্য আন্দোলন শুরু করে। ১৯১৯ সালের নির্বাচনে সমাজতন্ত্রী দল সংসদে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করায় সম্পত্তিশালী শ্রেণির মধ্যে সাম্যবাদ সম্পর্কে ভয় আরও বৃদ্ধি পায়। শিল্পপতি, জমিদার, বণিক, উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই আশঙ্কা করতে থাকে যে সমাজতন্ত্রীরা ক্ষমতায় এলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার নষ্ট হবে এবং রাশিয়ার মতো বিপ্লব ইতালিতেও সংঘটিত হবে। কিন্তু সমাজতন্ত্রী দলও এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি সুসংগঠিত বিকল্প সরকার গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। তাদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং আন্দোলন পরিচালনার সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষের একাংশকে হতাশ করে। এই পরিস্থিতিতে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দল সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। ফ্যাসিস্টদের Blackshirts বা কালো জামা বাহিনী সমাজতান্ত্রিক কার্যালয়, শ্রমিক সংগঠন ও বিরোধীদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের দমন করতে থাকে। অনেক শিল্পপতি ও জমিদার ফ্যাসিস্টদের আর্থিক ও রাজনৈতিক সাহায্য করতে শুরু করেন, কারণ তাঁরা ফ্যাসিস্টদেরকে সাম্যবাদী বিপ্লবের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে দেখেছিলেন। ফলে ফ্যাসিবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না; তা ক্রমে মধ্যবিত্ত, ধনী কৃষক, শিল্পপতি, জমিদার, প্রাক্তন সৈনিক এবং জাতীয়তাবাদী যুবকদের সমর্থন লাভ করে। সাম্যবাদ-ভীতি তাই মুসোলিনির ক্ষমতা দখলের অন্যতম প্রধান সহায়ক হয়ে ওঠে।
৫) মুসোলিনির নেতৃত্ব, ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ ও ক্ষমতা দখল: ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের ক্ষেত্রে বেনিতো মুসোলিনির ব্যক্তিগত নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মকারের পুত্র মুসোলিনি প্রথম জীবনে শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা ও সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সমাজতন্ত্রী পত্রিকা Avanti!-এর সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিকতাবাদের পরিবর্তে উগ্র জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করেন এবং পরে নিজস্ব রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯১৯ সালে তিনি Fasci Italiani di Combattimento প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯২১ সালে তা National Fascist Party-তে রূপান্তরিত হয়। ফ্যাসিবাদের মূল আদর্শ ছিল শক্তিশালী রাষ্ট্র, উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্যবাদ-বিরোধিতা, ব্যক্তির ওপর রাষ্ট্রের প্রাধান্য, শৃঙ্খলা এবং একজন শক্তিশালী নেতার প্রতি আনুগত্য। মুসোলিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি ইতালির জাতীয় গৌরব পুনরুদ্ধার করবেন, অর্থনৈতিক সংকট দূর করবেন এবং সমাজতান্ত্রিক বিশৃঙ্খলা দমন করবেন। তিনি একই সঙ্গে শিল্পপতি ও জমিদারদের আশ্বস্ত করেন যে ফ্যাসিবাদ ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষা করবে। এই বহুমুখী প্রচারের ফলে তাঁর জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফ্যাসিস্টদের শক্তি প্রদর্শনের চূড়ান্ত ঘটনা ছিল ১৯২২ সালের March on Rome। ফ্যাসিস্ট সমর্থকেরা রোমের দিকে অগ্রসর হলে রাজা ভিক্টর ইমানুয়েল তৃতীয় সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তাদের দমন করার পরিবর্তে মুসোলিনিকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। ৩০ অক্টোবর ১৯২২ সালে মুসোলিনি প্রধানমন্ত্রী হন। পরে তিনি ধীরে ধীরে সংসদীয় গণতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। সুতরাং মুসোলিনির ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক কৌশল, প্রচারক্ষমতা এবং সংগঠনশক্তি ফ্যাসিবাদের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
৬) জাতীয়তাবাদী ও আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি এবং ফ্যাসিবাদের উত্থানের সম্পর্ক: ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের সঙ্গে তার বৈদেশিক নীতিরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ‘বিকৃত বিজয়’-এর অনুভূতি ইতালীয় জাতীয়তাবাদকে তীব্র করে তুলেছিল এবং মুসোলিনি এই জাতীয়তাবাদকে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে দুর্বল উদারতন্ত্রী সরকার ইতালির আন্তর্জাতিক মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি এবং ফ্যাসিবাদই ইতালিকে একটি শক্তিশালী ও সম্মানিত রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে। ক্ষমতায় এসে মুসোলিনি প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের গৌরব পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখেন এবং ভূমধ্যসাগরে ইতালির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। ফিউমে নিয়ে ইতালির দাবি, বলকান অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং পরবর্তীকালে ১৯৩৫ সালে ইথিওপিয়া আক্রমণ তাঁর আগ্রাসী বৈদেশিক নীতির পরিচয় বহন করে। তিনি Mare Nostrum বা ভূমধ্যসাগরকে ইতালীয় প্রভাবাধীন করার ধারণা প্রচার করেন। এই নীতির উদ্দেশ্য ছিল একদিকে ইতালির আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা, অন্যদিকে দেশের জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগ ও ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রতি আনুগত্য সৃষ্টি করা। পরবর্তীকালে মুসোলিনি নাৎসি জার্মানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং ১৯৩৬ সালে Rome-Berlin Axis গঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি জার্মানির পাশে দাঁড়ালে যুদ্ধের বিপর্যয় ফ্যাসিস্ট শাসনের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। ১৯৪৩ সালে মিত্রবাহিনী ইতালিতে প্রবেশ করলে মুসোলিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ১৯৪৫ সালে তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইতালীয় ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটে। তাই বলা যায়, যুদ্ধোত্তর জাতীয় অপমান ও আগ্রাসী বৈদেশিক নীতি যেমন ফ্যাসিবাদের উত্থানে সহায়তা করেছিল, তেমনি অতিরিক্ত সাম্রাজ্যবাদী নীতি শেষ পর্যন্ত তার পতনের পথও প্রশস্ত করে।
উপসংহার: ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান কোনো একটি মাত্র কারণে ঘটেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়, ‘বিকৃত বিজয়’-এর জাতীয় হতাশা, বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতি, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন, উদারতন্ত্রী সরকারের অক্ষমতা, সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতা, সাম্যবাদ-ভীতি এবং সর্বোপরি মুসোলিনির দক্ষ নেতৃত্ব—এই সমস্ত কারণ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফ্যাসিবাদের উত্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। মুসোলিনি এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ফ্যাসিস্ট আন্দোলনকে জাতীয়তাবাদী ও সাম্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনে পরিণত করেন এবং ১৯২২ সালে ক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতায় এসে তিনি আগ্রাসী বৈদেশিক নীতির মাধ্যমে ইতালির আন্তর্জাতিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর নীতির ব্যর্থতা ফ্যাসিস্ট শাসনের পতন ঘটায়। অতএব, ইতালীয় ফ্যাসিবাদের উত্থান ছিল যুদ্ধোত্তর সংকট ও রাজনৈতিক দুর্বলতার ফল, আর তার পতন ছিল স্বৈরতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধনীতির স্বাভাবিক পরিণতি।
এখানে অল্প কিছু প্রশ্নোত্তর আপলোড করা হয়েছে যদি তোমার মনে হয় সাজেশনটি BUY করতে পারো ।
অথবা আপনি চাইলে সরাসরি PhonePe-এর মাধ্যমে 150 টাকা পেমেন্ট করে সাজেশন সংগ্রহ করতে পারেন। PhonePe নম্বর: 6295668424 (পেমেন্টের পর স্ক্রিনশট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে PDF COPY পাঠিয়ে দেব।)
সম্পূর্ণ সাজেশন টি ইউটিউবে দেখানো হয়েছে তুমি দেখে আসতে পারো।
Choose Your Semester
1st Semester থেকে 8th Semester পর্যন্ত সমস্ত Study Materials এক জায়গায়
7th Semester
Major 11 • Major 12 • Major 13 • Minor 1 • Minor 2