Kalyani University B.A 7th Semester Political Science Minor Question Answer 2026 | Last Minute Suggestion

Kalyani University Suggestion

Kalyani University B.A 7th Semester Political Science Minor Question Answer 2026 | Last Minute Suggestion

Feminism: Theory and Practice

Kalyani University B.A 7th Semester Political Science Minor Nep ছোট প্রশ্ন, বড়ো প্রশ্নের উত্তর সহ কমপ্লিট সাজেশন PDF টি পেতে.. তুমি 150 টাকা পেমেন্ট কর। পেমেন্টের পর এক সেকেন্ডের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সাজেশনটি পাবে। ধন্যবাদ। টাকা টি পেমেন্ট করার জন্য নিচে PAY বাটনে ক্লিক কর।

তুমি চাইলে সরাসরি PhonePe-এর মাধ্যমে 150 টাকা পেমেন্ট করে সাজেশন সংগ্রহ করতে পার। PhonePe নম্বর: 6295668424 (পেমেন্টের পর স্ক্রিনশট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে PDF COPY পাঠিয়ে দেব।)

My Phone Number- 6295668424

সম্পূর্ণ সাজেশন টি ইউটিউবে দেখানো হয়েছে তুমি দেখে আসতে পারো।

• এই সাজেশনের বড়ো প্রশ্ন সংখ্যা 28 টি।
ছোট প্রশ্ন প্রশ্নের উত্তর সহ কমপ্লিট সাজেশন পাবেন।
• নিরক্ষরেখে বলতে পারি এই সাজেশনেরর বাইরে কোন প্রশ্ন উত্তর আসবে না।
• ১০০% তোমরা কমন পাবে।
• এই সাজেশনের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সিলেবাস অনুযায়ী এবং ইউনিট অনুযায়ী সাজানো রয়েছে ।
• তোমরা চাইলে খুব সহজে BUY করতে পারো।
• THANK YOU.

এখানে অল্প কিছু প্রশ্নোত্তর আপলোড করা হয়েছে যদি তোমার মনে হয় সাজেশনটি BUY করতে পারো ।

(সিলেবাস –২০২৬)

Feminism: Theory and Practice

Unit–1: Approaches to Understanding Patriarchy: Feminist Theorising of the Sex/Gender Distinction. Biologism versus Social Constructivism – Understanding Patriarchy and Feminism – Liberal, Socialist, Marxist, Radical Feminism, New Feminist Schools/Traditions.
বাংলা: পিতৃতন্ত্র অনুধাবনের পন্থা: যৌনতা/লিঙ্গের পার্থক্যের নারীবাদী তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। জীববাদ বনাম সামাজিক গঠনবাদ; পিতৃতন্ত্র ও নারীবাদ অনুধাবন; উদারপন্থী, সমাজতান্ত্রিক, মার্ক্সবাদী, র‍্যাডিক্যাল নারীবাদ এবং নব্য নারীবাদী ধারা/ঐতিহ্য।

Unit–2: History of Feminism: Origins of Feminism in the West: France, Britain and United States of America.
বাংলা: নারীবাদের ইতিহাস: পাশ্চাত্যে নারীবাদের উৎপত্তি—ফ্রান্স, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীবাদের উদ্ভব।

Unit–3: Feminist Issues and Women's Participation in Anti-Colonial and National Liberation Movements with Special Focus on India. The Indian Experience: Traditional Historiography and Feminist Critiques. Social Reform Movements and Position of Women in India. History of Women's Struggle in India.
বাংলা: নারীবাদী বিষয়াবলি এবং ঔপনিবেশিকতাবিরোধী ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ, বিশেষত ভারতের প্রেক্ষাপটে। ভারতীয় অভিজ্ঞতা: প্রথাগত ইতিহাসচর্চা ও নারীবাদী সমালোচনা। সমাজসংস্কার আন্দোলন এবং ভারতে নারীর অবস্থান। ভারতে নারী আন্দোলনের ইতিহাস।

Unit–4: Family in Contemporary India – Patrilineal and Matrilineal Practices. Gender Relations in the Family, Patterns of Consumption: Intra-Household Divisions, Entitlements and Bargaining, Property Rights of Women in India.
বাংলা: সমসাময়িক ভারতে পরিবার—পিতৃসূত্রীয় ও মাতৃসূত্রীয় প্রথা। পরিবারে লিঙ্গগত সম্পর্ক, ভোগের ধরন; পরিবার-অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অধিকার ও দর-কষাকষি এবং ভারতে নারীর সম্পত্তির অধিকার।

Unit–5: Understanding Women's Work and Labour in India – Sexual Division of Labour, Productive and Reproductive Labour, Visible and Invisible Work – Unpaid (Reproductive and Care), Underpaid and Paid Work, Methods of Computing Women's Work, Female-Headed Households.
বাংলা: ভারতে নারীর কাজ ও শ্রম অনুধাবন—শ্রমের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন, উৎপাদনমূলক ও প্রজননমূলক শ্রম, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য কাজ; অবৈতনিক (প্রজনন ও পরিচর্যা) কাজ, স্বল্প-বেতনভুক্ত ও বেতনভুক্ত কাজ, নারীর কাজ গণনার পদ্ধতি এবং নারী-প্রধান পরিবার।

Unit: 1- পিতৃতন্ত্র অনুধাবনের পন্থা: যৌনতা/লিঙ্গের পার্থক্যের নারীবাদী তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। জীববাদ বনাম সামাজিক গঠনবাদ; পিতৃতন্ত্র ও নারীবাদ অনুধাবন; উদারপন্থী, সমাজতান্ত্রিক, মার্ক্সবাদী, র‍্যাডিক্যাল নারীবাদ এবং নব্য নারীবাদী ধারা/ঐতিহ্য।

*****1) প্রশ্ন. মার্কসীয় নারীবাদ সম্পর্কে আলোচনা করো! (৫)

ভূমিকা: মার্কসবাদ আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজচিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। মূলত শ্রেণিবৈষম্য, ব্যক্তিগত সম্পত্তি, উৎপাদনব্যবস্থা, শোষণ এবং শ্রেণিসংগ্রামের বিশ্লেষণকে কেন্দ্র করে মার্কসবাদ গড়ে উঠলেও এর মধ্য থেকেই নারীর সামাজিক অবস্থান ও শোষণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধারণার বিকাশ ঘটে। কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস নারীর অবস্থানকে তাঁদের সমস্ত তাত্ত্বিক আলোচনার প্রধান বিষয় হিসেবে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করেননি; কিন্তু তাঁদের সমাজ ও ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার মধ্যে নারী-পুরুষের সম্পর্ক, পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি, শ্রমবিভাজন এবং নারীর অধীনতার কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে এই ধারণাগুলির উপর ভিত্তি করে মার্কসীয় নারীবাদের বিকাশ ঘটে। মার্কসীয় নারীবাদীদের মতে, নারীর উপর নিপীড়নকে শুধু পুরুষের ব্যক্তিগত আধিপত্যের ফল হিসেবে দেখলে সমস্যাটির পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা, শ্রেণিবৈষম্য এবং গৃহস্থালি শ্রমের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই নারীর প্রকৃত মুক্তির জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন অপরিহার্য।

১. মার্কসীয় দর্শনের বস্তুবাদী ভিত্তি: মার্কসীয় নারীবাদের ভিত্তি বোঝার জন্য প্রথমে মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সম্পর্কে ধারণা জানা প্রয়োজন। মার্কসের মতে, মানুষের চিন্তা বা ধারণা সমাজের বস্তুগত জীবনের বাইরে স্বাধীনভাবে গড়ে ওঠে না; বরং মানুষের জীবনযাপন, উৎপাদনব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক তার সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সমাজের পরিবর্তনও কোনো সরল ও একরৈখিক প্রক্রিয়ায় ঘটে না; বিভিন্ন সামাজিক শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে পরিবর্তন আসে। মানুষের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি উৎপাদনের পদ্ধতি সমাজের মৌলিক ভিত্তি তৈরি করে। এই অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর রাজনীতি, আইন, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। উৎপাদনশক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে যখন বিরোধ সৃষ্টি হয়, তখন সেই দ্বন্দ্ব সামাজিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করে। মার্কস ও এঙ্গেলস মানবসমাজের ইতিহাসকে বিভিন্ন উৎপাদনব্যবস্থা ও শ্রেণিসম্পর্কের পরিবর্তনের ইতিহাস হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে দাসপ্রথা, সামন্ততন্ত্র এবং পরবর্তীকালে পুঁজিবাদী সমাজের বিকাশের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও শ্রেণিবৈষম্যেরও বিকাশ ঘটে। মার্কসীয় নারীবাদীরা এই বস্তুবাদী পদ্ধতিকে নারীর অবস্থান বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দেখান যে নারীর অধীনতা কোনো চিরন্তন বা প্রাকৃতিক বিষয় নয়; বরং নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

২. ব্যক্তিগত সম্পত্তি, পরিবার ও নারীর অধীনতা: নারীর অধীনতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের ‘পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ গ্রন্থটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এঙ্গেলসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানবসমাজের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বর্তমান ধারণা ছিল না এবং সামাজিক সম্পর্কও পরবর্তীকালের মতো কঠোরভাবে পিতৃতান্ত্রিক ছিল না। শ্রমবিভাজন থাকলেও নারীরা গৃহস্থালি ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা ভোগ করত। অনেক ক্ষেত্রে বংশপরিচয় মাতৃসূত্রে নির্ধারিত হওয়ায় ‘মাতৃঅধিকার’-এর ধারণারও অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু কৃষি, পশুপালন ও উৎপাদনব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে উদ্বৃত্ত সম্পদ সৃষ্টি হয় এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণার বিকাশ ঘটে। পুরুষরা যখন পশুসম্পদ ও অন্যান্য সম্পত্তির উপর অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে, তখন সেই সম্পত্তি নিজের সন্তানদের মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তরের প্রয়োজন দেখা দেয়। এর ফলে পিতৃপরিচয় নিশ্চিত করা এবং নারীর যৌনতা ও প্রজননক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা বাড়ে। একগামিতা, বিবাহ এবং পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ক্রমে শক্তিশালী হয়। এঙ্গেলসের মতে, এর ফলে নারী স্বাধীন সামাজিক সত্তা থেকে ধীরে ধীরে স্বামীর অধীনস্থ অবস্থানে চলে যায়। অর্থাৎ নারীর অধীনতা কোনো স্বাভাবিক বা চিরন্তন ঘটনা নয়; ব্যক্তিগত সম্পত্তি, উত্তরাধিকার এবং পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের বিকাশের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।

৩. উৎপাদন ও প্রজননের ক্ষেত্রে নারীর শ্রম: মার্কসীয় নারীবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল উৎপাদন ও প্রজননের পারস্পরিক সম্পর্ক। সমাজে মানুষের জীবনধারণের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি উৎপাদনের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের জন্ম ও লালন-পালনও অপরিহার্য। নারীরা সন্তান জন্মদান, সন্তান প্রতিপালন, পরিবারের সদস্যদের যত্ন এবং গৃহস্থালি কাজের মাধ্যমে সমাজের শ্রমশক্তি পুনরুৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজে এই গৃহস্থালি শ্রমের অধিকাংশই মজুরিবিহীন। ফলে নারীর শ্রম সমাজ ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার যথাযথ অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হয় না। পরিবারের মধ্যে নারী যে শ্রম দেয়, তা শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবন বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি তৈরি করতে সাহায্য করে। এই কারণে মার্কসীয় নারীবাদীরা মনে করেন, গৃহস্থালি শ্রমকে ব্যক্তিগত ও অপ্রয়োজনীয় কাজ হিসেবে দেখা ভুল। এটি বৃহত্তর উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নারী যদি বিনা মজুরিতে রান্না, পরিষ্কার, সন্তান পালন এবং পরিবারের যত্নের কাজ করে, তাহলে শ্রমশক্তির পুনরুৎপাদনের ব্যয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উপর কম পড়ে। এইভাবে নারীর অদৃশ্য ও মজুরিবিহীন শ্রম পুঁজিবাদী অর্থনীতির কার্যকারিতাকে সহায়তা করে। তাই নারীর মুক্তির প্রশ্নে গৃহস্থালি শ্রম, প্রজনন এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪. পুঁজিবাদ ও নারীর শোষণ: মার্কসীয় নারীবাদীদের মতে, পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা নারীর শোষণকে বিভিন্নভাবে বজায় রাখে। পুঁজিবাদে উৎপাদনের প্রধান উদ্দেশ্য হল মুনাফা অর্জন এবং শ্রম থেকে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করা। এই ব্যবস্থায় নারী একদিকে শ্রমবাজারে কম মজুরির শ্রমিক হিসেবে শোষিত হতে পারে, অন্যদিকে পরিবারের মধ্যে মজুরিবিহীন গৃহস্থালি শ্রম দিতে বাধ্য হয়। ফলে নারীর উপর দ্বৈত শ্রমের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করলেও গৃহস্থালি কাজের দায়িত্ব অনেক সময় নারীর উপরই থেকে যায়। আবার অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে পরিবারের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও সীমিত হয়। মার্কসীয় নারীবাদীরা তাই মনে করেন, নারীর সমস্যাকে কেবল আইনি সমতার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং উৎপাদনব্যবস্থার বৈষম্য দূর করাও প্রয়োজন। তাঁদের মতে, পুঁজিবাদী ব্যক্তিগত সম্পত্তির কাঠামো এবং পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক সম্পর্ক পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নারীর অধীনতাকে শক্তিশালী করতে পারে। এই কারণে নারীর মুক্তির জন্য উৎপাদনক্ষেত্রে সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, গৃহস্থালি শ্রমের স্বীকৃতি এবং সামাজিক সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন প্রয়োজন। মার্কসীয় নারীবাদ মূলত দেখাতে চায় যে নারীর ব্যক্তিগত সমস্যার পেছনে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ভূমিকা রয়েছে।

৫. আধুনিক মার্কসীয় নারীবাদের বিকাশ ও সমালোচনা: পরবর্তীকালে মার্কসীয় নারীবাদে নতুন কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। কেবল উৎপাদনক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করলেই যে নারী-পুরুষের বৈষম্য সম্পূর্ণ দূর হবে না, আধুনিক অভিজ্ঞতা থেকে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বহু সমাজে নারীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করলেও পরিবার, যৌনতা, গৃহস্থালি শ্রম ও সামাজিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে পুরুষের আধিপত্য বিভিন্নভাবে বজায় থাকে। ফলে আধুনিক মার্কসীয় নারীবাদীরা পুঁজিবাদ ও পিতৃতন্ত্র—দুই কাঠামোকেই বিশ্লেষণের আওতায় আনেন। তাঁদের মতে, শুধু অর্থনৈতিক উৎপাদন নয়, পরিবার ও প্রজননের ক্ষেত্রও ক্ষমতা ও বৈষম্যের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কিছু চিন্তাবিদ গৃহস্থালি কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং তার সামাজিক স্বীকৃতির দাবি তোলেন। আবার অনেকে দেখান যে অর্থনৈতিক ভিত্তির সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তবে মার্কসীয় নারীবাদের সমালোচনাও হয়েছে। ক্যাথারিন ম্যাককিনন ও শুলামিথ ফায়ারস্টোনের মতো নারীবাদী চিন্তাবিদেরা মনে করেন, কেবল শ্রেণি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সাহায্যে নারীর যৌন ও পিতৃতান্ত্রিক নিপীড়নের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। নারীর শরীর, যৌনতা ও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার স্বাধীন গুরুত্বও বিবেচনা করা দরকার। এই সমালোচনা মার্কসীয় নারীবাদকে আরও বিস্তৃতভাবে নারী-পুরুষ সম্পর্ক বিশ্লেষণের দিকে নিয়ে যায়।

৬. মার্কসীয় নারীবাদের গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা: মার্কসীয় নারীবাদের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হল এটি নারীর সমস্যাকে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যার সীমার মধ্যে না রেখে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে বিশ্লেষণ করেছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি, শ্রেণিবৈষম্য, পুঁজিবাদ, শ্রমবিভাজন, গৃহস্থালি শ্রম এবং প্রজননের সঙ্গে নারীর অধীনতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এই মতবাদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এটি বিশেষভাবে দেখিয়েছে যে নারীর গৃহস্থালি শ্রম অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন কাজ নয়। একই সঙ্গে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও উৎপাদনক্ষেত্রে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট করেছে। তবে এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অনেক সমালোচকের মতে, মার্কসীয় বিশ্লেষণ কখনও কখনও শ্রেণি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে পিতৃতন্ত্র, যৌনতা, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্বতন্ত্র প্রভাবকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। সব ধরনের নারীর অভিজ্ঞতাকেও শুধু শ্রেণি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তবু নারীর শোষণের অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং গৃহস্থালি শ্রমের গুরুত্ব সম্পর্কে যে গভীর বিশ্লেষণ মার্কসীয় নারীবাদ দিয়েছে, তা আধুনিক নারীবাদী চিন্তাকে যথেষ্ট সমৃদ্ধ করেছে। তাই এর সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও নারীর সামাজিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে মার্কসীয় নারীবাদের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

উপসংহার: মার্কসীয় নারীবাদ নারীর শোষণকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশ, পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের উত্থান, শ্রমবিভাজন, গৃহস্থালি শ্রম এবং পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থার মাধ্যমে নারীর অধীনতা কীভাবে বজায় থাকতে পারে, তা এই মতবাদ ব্যাখ্যা করেছে। এঙ্গেলসের পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কিত বিশ্লেষণ এই চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আধুনিক মার্কসীয় নারীবাদ আবার দেখিয়েছে যে নারীমুক্তির জন্য শুধু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ নয়, পরিবার, গৃহস্থালি শ্রম, প্রজনন ও সামাজিক ক্ষমতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন প্রয়োজন। যদিও পিতৃতন্ত্র ও যৌন রাজনীতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে মার্কসীয় নারীবাদের সমালোচনা হয়েছে, তবু নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং শোষণের কাঠামোগত কারণ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীর প্রকৃত মুক্তির জন্য অর্থনৈতিক সমতা, সামাজিক মর্যাদা এবং পিতৃতান্ত্রিক বৈষম্যের অবসান—এই তিনটির সমন্বিত পরিবর্তনই তাই অপরিহার্য।

Unit: 2- নারীবাদের ইতিহাস: পাশ্চাত্যে নারীবাদের উৎপত্তি—ফ্রান্স, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীবাদের উদ্ভব।

*****2) প্রশ্ন. পাশ্চাত্য বা বিশ্বের নারী আন্দোলনের উদ্ভব ও বিকাশ পর্যালোচনা করে। (১০/৫)

ভূমিকা: নারী আন্দোলন হল নারীর সমান অধিকার, স্বাধীনতা, মর্যাদা, সামাজিক ন্যায় এবং বৈষম্যহীন জীবন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা একটি দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সমাজে নারীরা প্রধানত পরিবার ও গৃহকেন্দ্রিক ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আধুনিক যুগে শিক্ষা, শিল্পায়ন, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নারীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। যদিও ষোড়শ ও সপ্তদশ শতক থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে নারীর অধিকার নিয়ে কিছু রচনা ও প্রতিবাদ দেখা যায়, তবুও সংগঠিত নারী আন্দোলনের সূচনা সাধারণত অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে, বিশেষত ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের সময় থেকে ধরা হয়। পরবর্তীকালে ইউরোপ ও আমেরিকায় ভোটাধিকার, শিক্ষার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, সমমজুরি, বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ, প্রজনন অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন বিস্তৃত হয়। বিংশ শতকে এই আন্দোলন প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তরঙ্গের মধ্য দিয়ে নতুন নতুন মাত্রা লাভ করে।

১. ফরাসি বিপ্লব ও নারী আন্দোলনের সূচনা: পাশ্চাত্যের সংগঠিত নারী আন্দোলনের বিকাশে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব একটি ঐতিহাসিক মোড়। ফরাসি বিপ্লবের ‘স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী’-র আদর্শ নারীদেরও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। বিপ্লবে নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করলেও বিপ্লবের সাফল্যের পরও তাঁদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৭৯১ সালের সংবিধানে পুরুষদের সীমিত ভোটাধিকার স্বীকৃত হলেও নারীরা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। ফলে নারী আন্দোলনের মধ্যে তীব্র প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। অলিম্প দ্য গুজ ‘নারী ও নারী নাগরিকের অধিকারের ঘোষণা’ প্রকাশ করে নারী-পুরুষের সমান রাজনৈতিক অধিকার দাবি করেন এবং তাঁর বক্তব্যের জন্য তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সময়ে মেরি ওলস্টোনক্রাফট তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘A Vindication of the Rights of Woman’ (১৭৯২)-এ নারীর শিক্ষা, যুক্তিবোধ ও স্বাধীনতার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি দেন। তিনি দেখান যে নারী জন্মগতভাবে দুর্বল বা অযৌক্তিক নয়; সামাজিক ও শিক্ষাগত বৈষম্যের কারণেই নারীরা পিছিয়ে থাকে। তাঁর চিন্তার মধ্য দিয়ে উদারপন্থী নারীবাদের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়। ফরাসি বিপ্লব তাই শুধু রাজনৈতিক বিপ্লব ছিল না; এটি নারীকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২. উনিশ শতকে নারী আন্দোলনের বিস্তার ও প্রথম দিকের দাবি: ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব ধীরে ধীরে ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। উনিশ শতকে শিল্পবিপ্লব ও নগরায়ণের ফলে বিপুল সংখ্যক নারী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাঁরা কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিরাপদ পরিবেশ ও নানা ধরনের বৈষম্যের সম্মুখীন হন। ফলে শ্রমজীবী নারীদের মধ্যেও সংগঠিত আন্দোলনের বিকাশ ঘটে। ব্রিটেনে নারীরা ভোটাধিকার, সম্পত্তির অধিকার ও শিক্ষার সুযোগের জন্য আন্দোলন শুরু করেন। আমেরিকায় ১৮৪৮ সালের সেনেকা ফলস সম্মেলন নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেখানে নারী-পুরুষের সমান অধিকার, ভোটাধিকার এবং সামাজিক মর্যাদার দাবি উত্থাপিত হয়। উনিশ শতকের শেষভাগে নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলন বিশেষ শক্তিশালী হয় এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশে নারীরা রাজনৈতিক অধিকার লাভ করতে শুরু করেন। একই সময়ে শ্রমজীবী নারীদের আন্দোলন আন্তর্জাতিক চরিত্র লাভ করে। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে ক্লারা জেটকিন আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক নারী দিবস বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার ও সমতার প্রতীক হয়ে ওঠে। এই সময়ের আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভোটাধিকার, শিক্ষা, সম্পত্তির অধিকার, কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য মজুরি ও আইনগত সমতা প্রতিষ্ঠা।

৩. নারী আন্দোলনের প্রথম পর্ব বা প্রথম তরঙ্গ: নারী আন্দোলনের প্রথম তরঙ্গ মূলত উনিশ শতক থেকে বিংশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পর্যায়ের আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল আইনগত ও রাজনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠার দাবি। নারীরা ভোটাধিকার, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, শিক্ষা, সম্পত্তির মালিকানা, কর্মসংস্থান এবং বিবাহ ও পারিবারিক জীবনে আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেন। ব্রিটেনে ‘সাফ্রাজেট’ আন্দোলন নারীদের ভোটাধিকারের দাবিকে বিশেষভাবে শক্তিশালী করে। আমেরিকাতেও নারীরা দীর্ঘ সংগ্রামের পর ভোটাধিকার অর্জন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশে নারীরা পুরুষদের অনুপস্থিতিতে কলকারখানা, হাসপাতাল, প্রশাসন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সক্ষমতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আসে। তবে প্রথম তরঙ্গের কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ প্রধানত মধ্যবিত্ত ও শ্বেতাঙ্গ নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং শ্রমজীবী, কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য প্রান্তিক নারীদের অভিজ্ঞতা অনেক সময় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। তাছাড়া এই পর্যায়ে মূলত নির্দিষ্ট অধিকার অর্জনের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল; পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। তবু নারীর রাজনৈতিক নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রথম তরঙ্গের ঐতিহাসিক অবদান অপরিসীম।

৪. নারী আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব বা দ্বিতীয় তরঙ্গ: ১৯৬০-এর দশক থেকে নারী আন্দোলনে একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়, যা দ্বিতীয় তরঙ্গ নামে পরিচিত। ১৯৬৩ সালে বেটি ফ্রিডানের ‘The Feminine Mystique’ প্রকাশিত হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই নতুন আন্দোলন বিশেষ গতি লাভ করে। প্রথম তরঙ্গ যেখানে প্রধানত ভোটাধিকার ও আইনগত সমতার উপর জোর দিয়েছিল, দ্বিতীয় তরঙ্গ সেখানে নারীর দৈনন্দিন জীবন, পরিবার, যৌনতা, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। এই পর্যায়ের নারীবাদীরা বলেন যে নারী-পুরুষের বৈষম্য কেবল আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমাজের সংস্কৃতি, পরিবার ও সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যেও তা গভীরভাবে নিহিত। সিমন দ্য বোভোয়ার, কেট মিলেট, জারমেইন গ্রিয়ার, শীলা রোবথাম প্রমুখ চিন্তাবিদ এই পর্যায়ের নারীবাদী চিন্তাকে সমৃদ্ধ করেন। কেট মিলেট তাঁর ‘Sexual Politics’ গ্রন্থে দেখান যে ব্যক্তিগত ও যৌন সম্পর্কের মধ্যেও ক্ষমতার রাজনীতি কাজ করে। তাই এই পর্যায়ে ‘ব্যক্তিগতই রাজনৈতিক’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিবারের মধ্যে গৃহস্থালি কাজের অসম বণ্টন, নারীর উপর পারিবারিক হিংসা, যৌন নিপীড়ন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, গর্ভপাতের অধিকার এবং প্রজনন-স্বাধীনতার মতো বিষয় আন্দোলনের কেন্দ্রে আসে। ফলে নারী আন্দোলন একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের আন্দোলনে পরিণত হয়।

৫. দ্বিতীয় তরঙ্গের বৈচিত্র্য ও পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম: দ্বিতীয় তরঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল নারীবাদী চিন্তার বহুমুখী বিকাশ। উদারপন্থী নারীবাদীরা আইনগত ও সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্ব দেন। মার্কসীয় ও সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীরা পুঁজিবাদ ও পিতৃতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে নারীর অর্থনৈতিক শোষণের অবসান চান। বৈপ্লবিক নারীবাদীরা পিতৃতন্ত্রকে নারীর নিপীড়নের মূল কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং পরিবার, বিবাহ, যৌনতা ও প্রজনন ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রশ্ন করেন। এই পর্যায়ে সমকামী নারীদের অধিকার ও যৌন পরিচয়ের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অ্যাড্রিয়েন রিচ বাধ্যতামূলক বিষমকামিতার সমালোচনা করে নারীর স্বাধীন যৌন পরিচয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সময়ে ‘নারীর ব্যক্তিগত জীবনও রাজনৈতিক’—এই ধারণা পারিবারিক সমস্যাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করে। নারীর গৃহস্থালি শ্রমের স্বীকৃতি, সমমজুরি, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বন্ধ, নিরাপদ গর্ভপাত, জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি আরও শক্তিশালী হয়। ফলে দ্বিতীয় তরঙ্গ নারী আন্দোলনকে শুধুমাত্র ভোটাধিকার বা আইনগত অধিকারের আন্দোলন না রেখে সমাজের ক্ষমতা ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের আন্দোলনে পরিণত করে।

৬. নারী আন্দোলনের তৃতীয় পর্ব বা তৃতীয় তরঙ্গ: ১৯৯০-এর দশক থেকে নারী আন্দোলনের তৃতীয় তরঙ্গের বিকাশ ঘটে। দ্বিতীয় তরঙ্গ নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করলেও সব নারীর অভিজ্ঞতা ও সমস্যাকে সমানভাবে তুলে ধরতে পারেনি—এই সমালোচনা থেকেই তৃতীয় তরঙ্গের বিকাশ। ১৯৯১ সালে রেবেকা ওয়াকারের ‘Becoming the Third Wave’ প্রবন্ধটি এই পর্যায়ের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় তরঙ্গের নারীবাদ উত্তর-আধুনিকতা, উত্তর-কাঠামোবাদ এবং আন্তঃসংযোগমূলক চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত। এই পর্যায়ের নারীবাদীরা মনে করেন, সব নারী একই ধরনের নিপীড়নের শিকার হন না। শ্রেণি, জাতি, বর্ণ, সংস্কৃতি, যৌনতা, ধর্ম ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে নারীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে। তাই একমাত্র ‘নারী’ পরিচয়ের ভিত্তিতে সব সমস্যাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বেল হুকস, গ্লোরিয়া আনজালদুয়া, চেরি মোরাগা প্রমুখ চিন্তাবিদ এই বহুমাত্রিক নারীবাদী চিন্তাকে সমৃদ্ধ করেন। তৃতীয় তরঙ্গের আন্দোলনে যৌনতা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, শরীর সম্পর্কে সামাজিক ধারণা, গণমাধ্যমে নারীর উপস্থাপন, মানসিক নিপীড়ন এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের স্বাধীনতা গুরুত্ব পায়। অল্পবয়সী নারীদের অংশগ্রহণও এই পর্যায়ের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

৭. সমকালীন নারী আন্দোলন ও তার সম্প্রসারণ: বর্তমান সময়ে নারী আন্দোলন আরও বহুমাত্রিক ও বিশ্বব্যাপী রূপ লাভ করেছে। নারীর ভোটাধিকার বা আইনগত সমতার পাশাপাশি এখন যৌন হয়রানি, পারিবারিক হিংসা, মানব পাচার, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, সমমজুরি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রজনন অধিকার, ডিজিটাল হয়রানি এবং নারীর শরীর সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্তের মতো বিষয় আলোচিত হচ্ছে। তৃতীয় তরঙ্গের পর নারীবাদী চিন্তায় আরও বিভিন্ন ধারা বিকশিত হয়েছে। ধর্মীয় নারীবাদ ধর্মগ্রন্থ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও প্রথার মধ্যে নিহিত পুরুষকেন্দ্রিকতার সমালোচনা করে। পরিবেশবাদী নারীবাদ নারী নিপীড়নের সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশের উপর আধিপত্যের সম্পর্ক খুঁজে দেখে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে নারী আন্দোলনের স্বতন্ত্র রূপ গড়ে উঠেছে। ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নারী আন্দোলনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে; যৌন হয়রানি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে অনলাইন প্রচারাভিযান বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে পাশ্চাত্যে শুরু হওয়া নারী আন্দোলন আজ আর কেবল ইউরোপ বা আমেরিকার আন্দোলন নয়; এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নারীদের সামাজিক ন্যায়, মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমঅধিকারের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

উপসংহার: পাশ্চাত্য বা বিশ্বের নারী আন্দোলনের ইতিহাস মূলত নারীকে অধীন ও প্রান্তিক অবস্থান থেকে স্বাধীন ও সমমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিকে পরিণত করার দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ফরাসি বিপ্লবের সময় স্বাধীনতা ও সাম্যের দাবির মধ্য দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা, তা উনিশ শতকে ভোটাধিকার ও আইনগত অধিকারের সংগ্রামে পরিণত হয়; প্রথম তরঙ্গে রাজনৈতিক নাগরিকত্বের দাবি শক্তিশালী হয়; দ্বিতীয় তরঙ্গে পিতৃতন্ত্র, পরিবার, যৌনতা ও ব্যক্তিগত জীবনের রাজনীতিকরণ ঘটে; তৃতীয় তরঙ্গে শ্রেণি, বর্ণ, সংস্কৃতি, যৌনতা ও পরিচয়ের বৈচিত্র্য গুরুত্ব পায়। বর্তমান সময়ে এই আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ডিজিটাল ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাই নারী আন্দোলন কেবল নারীর বিশেষ অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন নয়; এটি একটি অধিক সাম্যপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলন।

Unit: 3- নারীবাদী বিষয়াবলি এবং ঔপনিবেশিকতাবিরোধী ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ, বিশেষত ভারতের প্রেক্ষাপটে। ভারতীয় অভিজ্ঞতা: প্রথাগত ইতিহাসচর্চা ও নারীবাদী সমালোচনা। সমাজসংস্কার আন্দোলন এবং ভারতে নারীর অবস্থান। ভারতে নারী আন্দোলনের ইতিহাস।

*****3) প্রশ্ন. ঔপনিবেশিক শাসনকালে ভারতে নারীশিক্ষা ও সংগঠনের কীরূপ বিকাশ সংঘটিত হয়েছিল তা আলোচনা করো। (৫/১০)

ভূমিকা: ঔপনিবেশিক শাসনকালে ভারতীয় সমাজে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার মধ্যে নারীশিক্ষার প্রসার ছিল অন্যতম। উনিশ শতকের প্রথমদিকে ভারতীয় সমাজে নারীদের শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ নারী গৃহের চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকতেন এবং বাল্যবিবাহ, পর্দাপ্রথা, কৌলিন্যপ্রথা, বহুবিবাহ, বিধবাদের দুর্দশা ইত্যাদি সামাজিক সমস্যার কারণে তাঁদের স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতো। এই পরিস্থিতিতে খ্রিস্টান মিশনারি, ভারতীয় সমাজসংস্কারক, শিক্ষাবিদ এবং পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক সরকার নারীশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জ্যোতিবা ফুলে, মহর্ষি ধোন্দো কেশব কারভে, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, স্বামী বিবেকানন্দ এবং বেগম রোকেয়ার মতো ব্যক্তিত্ব নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করেন। ফলে উনিশ শতকে নারীশিক্ষার একটি নতুন যুগের সূচনা হয় এবং পরবর্তীকালে এই আন্দোলন সংগঠিত নারীজাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।

১. খ্রিস্টান মিশনারিদের উদ্যোগে নারীশিক্ষার সূচনা: ভারতে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক নারীশিক্ষার প্রসারে খ্রিস্টান মিশনারিদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের প্রথমদিকে মিশনারিদের কার্যকলাপ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকলেও ধীরে ধীরে তাঁরা ভারতীয় সমাজে শিক্ষাবিস্তার, বিশেষত বালিকাদের শিক্ষার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বাংলায় রবার্ট মে-এর উদ্যোগে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে চুঁচুড়ায় একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা নারীশিক্ষার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এরপর বিভিন্ন মিশনারি সংস্থা ভারতের নানা অঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করতে শুরু করে। ‘চার্চ মিশনারি সোসাইটি’ দক্ষিণ ভারতে নারীশিক্ষার প্রসারে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে। ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে তিরুনেলভেলিতে একটি আবাসিক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কটিশ মিশনারি সংস্থাগুলিও দক্ষিণ ভারতে একাধিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। মিশনারিদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার, কিন্তু তাঁদের বিদ্যালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় মেয়েরা পড়াশোনা, লেখাপড়া ও বিভিন্ন ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। ফলে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি নতুন সামাজিক পরিবেশ তৈরি হয়। প্রথমদিকে রক্ষণশীল হিন্দু ও মুসলিম সমাজের অনেক পরিবার মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে অনিচ্ছুক ছিল। তবুও মিশনারিদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় নারীশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়।

২. রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর ও সমাজসংস্কারকদের ভূমিকা: নারীশিক্ষার প্রসারের সঙ্গে উনিশ শতকের সমাজসংস্কার আন্দোলনের গভীর সম্পর্ক ছিল। রাজা রামমোহন রায় নারীর সামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন শুরু করেন। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর ঐতিহাসিক আন্দোলন নারীসমাজকে সামাজিক নিপীড়ন থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি মনে করতেন, নারীর উন্নতির জন্য সামাজিক কুসংস্কার দূর করার পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণীয়। জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের উদ্যোগে ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে বেথুন স্কুল নামে পরিচিত হয়। বিদ্যাসাগর এই প্রতিষ্ঠান ও নারীশিক্ষা বিস্তারে সক্রিয় সহযোগিতা করেন। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং সমাজের বিরোধিতা সত্ত্বেও নারীশিক্ষার পক্ষে প্রচার চালান। একই সঙ্গে বিধবাবিবাহ আন্দোলনের মাধ্যমে নারীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির চেষ্টা করেন এবং ১৮৫৬ সালের বিধবাবিবাহ আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে উনিশ শতকের বাংলায় নারীশিক্ষা ও নারীসংস্কারের আন্দোলন পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে।

৩. ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে সমাজসংস্কার ও নারীশিক্ষার বিস্তার: নারীশিক্ষার আন্দোলন শুধু বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সমাজসংস্কারকরা নারীশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহারাষ্ট্রে জ্যোতিবা ফুলে নারীশিক্ষার অন্যতম অগ্রদূত ছিলেন। তাঁর স্ত্রী সাবিত্রীবাই ফুলে ভারতের প্রথমদিকের নারী শিক্ষিকাদের মধ্যে অন্যতম এবং তিনি বালিকাদের জন্য বিদ্যালয় পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহারাষ্ট্রে বিষ্ণুশাস্ত্রী পণ্ডিত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ সমাজসংস্কারকরাও নারীশিক্ষা ও বিধবাবিবাহের পক্ষে আন্দোলন করেন। অন্ধ্রপ্রদেশে কন্দুকুরি বীরেশলিঙ্গম নারীশিক্ষা ও বিধবাবিবাহের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পারসি সমাজেও নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের জন্য আন্দোলন গড়ে ওঠে। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী প্রতিষ্ঠিত আর্য সমাজও নারীশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে এবং বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা প্রভৃতি কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করে। স্বামী বিবেকানন্দও নারীশিক্ষাকে জাতীয় উন্নতির অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর মতে, নারীকে শিক্ষিত ও আত্মনির্ভর করে তুলতে পারলেই সমাজের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব। এইভাবে বিভিন্ন প্রদেশে সমাজসংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে নারীশিক্ষার প্রসার যুক্ত হয়ে ভারতীয় নারীজাগরণের ভিত্তি শক্তিশালী করে।

৪. মহর্ষি কারভে ও উচ্চশিক্ষায় নারীর অগ্রগতি: উনিশ শতকের শেষভাগে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে মহর্ষি ধোন্দো কেশব কারভের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিধবাদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি হিন্দু বিধবা গৃহ বা বিধবা শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। পরবর্তীকালে তাঁর প্রচেষ্টায় অনাথ বালিকাশ্রম, মহিলা বিদ্যালয় এবং নারীদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। নারীকে কেবল প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে নারীদের জন্য একটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে শ্রীমতী নাথিবাই দামোদর ঠাকরসি মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় বা এস.এন.ডি.টি. মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত হয়। যদিও এই প্রতিষ্ঠান উনিশ শতকের পরে প্রতিষ্ঠিত, এর ভিত্তি উনিশ শতকের নারীশিক্ষা ও সমাজসংস্কার আন্দোলনের মধ্যেই নিহিত ছিল। কারভের উদ্যোগ প্রমাণ করে যে নারীশিক্ষার আন্দোলন ধীরে ধীরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হচ্ছিল। ফলে শিক্ষিত নারীর একটি নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হতে শুরু করে, যারা পরবর্তীকালে সমাজসংস্কার, সাহিত্য, চিকিৎসা, শিক্ষকতা ও জাতীয় আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।

৫. মুসলিম সমাজে নারীশিক্ষা ও বেগম রোকেয়ার ভূমিকা: উনিশ শতকের নারীশিক্ষার আন্দোলন হিন্দু সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; মুসলিম সমাজেও নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। মুসলিম সমাজের আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদিও তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষার বিস্তার, তাঁর চিন্তাধারা পরবর্তীকালে মুসলিম নারীদের শিক্ষার প্রশ্নেও প্রভাব ফেলেছিল। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতকের শুরুতে মুসলিম নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের দাবি আরও জোরালো হয়। বেগম রোকেয়া এই আন্দোলনের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তিনি মনে করতেন, নারীশিক্ষার অভাবই নারীর সামাজিক পশ্চাৎপদতার অন্যতম কারণ। তিনি মুসলিম নারীদের শিক্ষার জন্য বিশেষভাবে কাজ করেন এবং পরবর্তীকালে কলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লেখনী ও সমাজসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করে। বেগম রোকেয়ার কাজের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়—নারীর উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা কেবল পুরুষ সমাজসংস্কারকদের হাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; নারীরাও নিজেরাই শিক্ষা, স্বাধীনতা ও সামাজিক অধিকার সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে এবং সংগঠিত হতে শুরু করেন।

৬. ঔপনিবেশিক সরকারের উদ্যোগ ও শিক্ষা নীতির প্রভাব: নারীশিক্ষার প্রসারে ঔপনিবেশিক সরকারের ভূমিকা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। প্রথমদিকে ব্রিটিশ সরকার সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে অনিচ্ছুক ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সরকার নারীশিক্ষার প্রতিও গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ১৮৫৪ সালের উডের ডেসপ্যাচে নারীশিক্ষার প্রসারের প্রয়োজনীয়তার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। এর ফলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন অঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিবেশ তৈরি হয়। দেশীয় রাজ্যগুলিও অনেক ক্ষেত্রে নারীশিক্ষার প্রসারে সাহায্য করে। ঊনিশ শতকের শেষভাগে নারীশিক্ষার জন্য সরকারি অনুদান, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষিকা তৈরির ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। তবে নারীশিক্ষার অগ্রগতি সর্বত্র সমান ছিল না। শহর ও উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে শিক্ষার সুযোগ তুলনামূলকভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারের নারীরা দীর্ঘদিন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। সামাজিক কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, পর্দাপ্রথা, দারিদ্র্য এবং নারীশিক্ষা সম্পর্কে রক্ষণশীল মনোভাব শিক্ষার প্রসারে বাধা সৃষ্টি করেছিল। তবুও সরকারি নীতি ও সমাজসংস্কারকদের যৌথ প্রচেষ্টায় নারীশিক্ষার জন্য একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠতে শুরু করে।

৭. নারীশিক্ষার অগ্রগতি, সীমাবদ্ধতা ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য: উনিশ শতকের নারীশিক্ষার অগ্রগতি ছিল ধীর কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শতাব্দীর শুরুতে যেখানে অধিকাংশ নারী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিলেন, শতাব্দীর শেষদিকে বিভিন্ন শহরে বালিকা বিদ্যালয়, উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান এবং নারীশিক্ষার জন্য সংগঠন গড়ে উঠতে শুরু করে। শিক্ষিত নারীরা শিক্ষকতা, চিকিৎসা, সাহিত্য ও সমাজসংস্কারের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ পান। নারীশিক্ষার বিস্তারের ফলে নারীদের মধ্যে আত্মসচেতনতা, অধিকারবোধ এবং সামাজিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। তবে এই অগ্রগতি ছিল সীমিত ও অসম। উচ্চবর্ণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারে শিক্ষার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও দরিদ্র, নিম্নবর্ণ, গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীরা অনেকাংশে এর বাইরে থেকে যায়। সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং বাল্যবিবাহও শিক্ষার পথে বড় বাধা ছিল। তবুও নারীশিক্ষার আন্দোলন ভারতীয় সমাজে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে। শিক্ষিত নারীরা পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, সমাজসংস্কার, সাহিত্য ও জনজীবনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। অর্থাৎ উনিশ শতকের নারীশিক্ষা কেবল শিক্ষার প্রসার ছিল না; এটি ভারতীয় নারীজাগরণ, সামাজিক সংস্কার এবং পরবর্তীকালের নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।

উপসংহার: ঔপনিবেশিক আমলে নারীশিক্ষার বিকাশ ছিল একটি দীর্ঘ ও সংগ্রামপূর্ণ প্রক্রিয়া। খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রাথমিক উদ্যোগ, রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের মতো সমাজসংস্কারকদের আন্দোলন, জ্যোতিবা ও সাবিত্রীবাই ফুলে, বীরেশলিঙ্গম, কারভে প্রমুখের প্রচেষ্টা, মুসলিম সমাজে শিক্ষার প্রসার এবং ঔপনিবেশিক সরকারের শিক্ষানীতি—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে নারীশিক্ষার একটি নতুন যুগের সূচনা হয়। যদিও উনিশ শতকের শেষে নারীশিক্ষার হার এখনও খুব কম ছিল এবং সামাজিক বৈষম্য ও কুসংস্কার বহুলাংশে বজায় ছিল, তবুও এই সময়ের আন্দোলন ভারতীয় সমাজে নারীর অবস্থান পরিবর্তনের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে। নারীকে গৃহের সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে শিক্ষিত, সচেতন ও আত্মনির্ভর ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া উনিশ শতকে শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে বিশ শতকের নারীজাগরণ ও নারী অধিকার আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করে।

Unit: 4- সমসাময়িক ভারতে পরিবার—পিতৃসূত্রীয় ও মাতৃসূত্রীয় প্রথা। পরিবারে লিঙ্গগত সম্পর্ক, ভোগের ধরন; পরিবার-অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অধিকার ও দর-কষাকষি এবং ভারতে নারীর সম্পত্তির অধিকার।

*****4) প্রশ্ন. ভারতে নারীর সম্পত্তিতে অধিকার সম্পর্কে আলোচনা কর।(১০/৫)

ভূমিকা: ভারতীয় সমাজ ঐতিহাসিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর দ্বারা প্রভাবিত। এই সমাজব্যবস্থায় পরিবার, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে পুরুষকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়েছে এবং বহু সময় নারীদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বিশেষত পৈতৃক সম্পত্তিতে কন্যার অধিকার, স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার এবং পরিবারের সম্পত্তিতে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য দেখা গেছে। স্বাধীনতার পর ভারতীয় সংবিধান নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার নীতি গ্রহণ করে এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন আইন ও বিচারিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নারীর সম্পত্তির অধিকারকে আরও সুদৃঢ় করা হয়। ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি আইন না থাকায় বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির নিয়মে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে আধুনিক ভারতীয় আইনব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হল নারীর সম্পত্তিগত অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বৈষম্য কমিয়ে আনা। বিশেষত হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের ২০০৫ সালের সংশোধন কন্যার পৈতৃক সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। ফলে বর্তমানে নারীরা কন্যা, স্ত্রী বা মা হিসেবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করতে পারেন।

১. সম্পত্তির অধিকার ও ভারতীয় আইনব্যবস্থা: ভারতে সম্পত্তির অধিকার বর্তমানে মৌলিক অধিকার নয়, তবে এটি একটি সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে সুরক্ষিত অধিকার। সংবিধানের ৪৪তম সংশোধনের মাধ্যমে সম্পত্তির অধিকার মৌলিক অধিকারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং সংবিধানের ৩০০এ অনুচ্ছেদে বলা হয় যে আইন দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতি ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে তাঁর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। অর্থাৎ নারী বা পুরুষ—কোনো ব্যক্তির সম্পত্তির অধিকার সম্পূর্ণভাবে আইনের সুরক্ষার বাইরে নয়। মানবাধিকারের বৃহত্তর ধারণার মধ্যেও সম্পত্তির অধিকারকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়, কারণ সম্পত্তির মালিকানা ব্যক্তির অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভারতে ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন প্রচলিত থাকার কারণে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার বিধিতে পার্থক্য রয়েছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখদের ক্ষেত্রে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, মুসলিমদের ক্ষেত্রে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন এবং অন্যান্য কিছু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে পৃথক আইন প্রযোজ্য হয়। তবে সংবিধানের সমতার নীতি নারীর অধিকারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। সম্পত্তির মালিকানা নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি করে এবং পরিবারে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা শক্তিশালী করে। তাই নারীর সম্পত্তির অধিকার কেবল অর্থনৈতিক সুবিধা নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও ক্ষমতায়নের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

২. হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার ও ঐতিহাসিক পরিবর্তন: স্বাধীনতার আগে হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার অত্যন্ত সীমিত ছিল এবং বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত হিন্দু আইনের পৃথক ব্যবস্থার কারণে উত্তরাধিকারের নিয়মেও পার্থক্য দেখা যেত। দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা ছিল হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ধারা। মিতাক্ষরা মূলত যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতির উপর রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্য এবং জন্মসূত্রে উত্তরাধিকারের ধারণার সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে জীমূতবাহনের রচিত দায়ভাগ বাংলাসহ কিছু অঞ্চলে বিশেষ প্রভাবশালী ছিল। এই ঐতিহাসিক ব্যবস্থাগুলিতে নারীর সম্পত্তির অধিকার পুরুষের সমতুল্য ছিল না। স্বাধীনতার পর আইন সংস্কারের মাধ্যমে এই বৈষম্য দূর করার চেষ্টা শুরু হয়। ১৯৫৬ সালে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন প্রণীত হওয়া এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই আইনের মাধ্যমে হিন্দু নারীর উত্তরাধিকার সম্পর্কিত অধিকারকে একটি সর্বভারতীয় আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়। পরবর্তীকালে ২০০৫ সালের সংশোধন নারীর সম্পত্তির অধিকারকে আরও শক্তিশালী করে। বিশেষ করে কন্যাকে পুত্রের সমানভাবে যৌথ পারিবারিক সম্পত্তির সহ-অংশীদার বা কোপারসেনার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে কন্যার অধিকার আর কেবল বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না; জন্মসূত্রেই সে যৌথ পারিবারিক সম্পত্তিতে পুত্রের সমান অধিকার লাভ করল।

৩. ২০০৫ সালের সংশোধন ও কন্যার সমান অধিকার: হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলির একটি হল ২০০৫ সালের সংশোধন। এই সংশোধনের আগে যৌথ হিন্দু পারিবারিক সম্পত্তিতে কন্যার অবস্থান পুত্রের সমতুল্য ছিল না। ২০০৫ সালের সংশোধনের মাধ্যমে হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের মিতাক্ষরা-ভিত্তিক যৌথ সম্পত্তিতে কন্যাকে পুত্রের মতোই জন্মসূত্রে কোপারসেনার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ কন্যা বিবাহিত হলেও তাঁর এই অধিকার নষ্ট হয় না। তিনি পুত্রের মতোই যৌথ পারিবারিক সম্পত্তিতে অংশ দাবি করতে পারেন এবং প্রয়োজনে সেই সম্পত্তির বিভাজনও দাবি করতে পারেন। এই পরিবর্তনের ফলে বিবাহকে আর কন্যার পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার হারানোর কারণ হিসেবে গণ্য করা যায় না। সুপ্রিম কোর্টের ২০২০ সালের Vineeta Sharma বনাম Rakesh Sharma মামলার রায়ে স্পষ্ট করা হয় যে কন্যার এই কোপারসেনারি অধিকার জন্মসূত্রে অর্জিত এবং পিতা ৯ সেপ্টেম্বর ২০০৫ তারিখে জীবিত ছিলেন কি না, তার উপর এই অধিকার নির্ভর করে না। এই রায় পূর্ববর্তী কিছু বিচারিক বিভ্রান্তির অবসান ঘটিয়ে কন্যার সমানাধিকারের বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট করে। ফলে আধুনিক হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে কন্যা কেবল পরিবারের সদস্য নয়; সে পুত্রের সমান সম্পত্তিগত অধিকারসম্পন্ন একজন আইনগত অংশীদার।

৪. পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অধিকার: হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের অধীনে পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অধিকার সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও আইনি বিতর্ক ছিল। বিশেষত বিবাহিত কন্যা পিতার সম্পত্তিতে অধিকার দাবি করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে বহু ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল। বর্তমানে ২০০৫ সালের সংশোধনের ফলে যৌথ পারিবারিক সম্পত্তির ক্ষেত্রে কন্যা জন্মসূত্রে পুত্রের সমান অধিকার লাভ করেন। বিবাহিত হওয়া এই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। পিতা যদি কোনো বৈধ উইল না করে মারা যান, তাহলে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার বিধি অনুযায়ী কন্যা অন্যান্য প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে সম্পত্তিতে অংশ পেতে পারেন। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার—কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় তাঁর স্বতন্ত্র ও উইলযোগ্য সম্পত্তি সম্পর্কে বৈধ উইল করলে সেই উইলের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। অন্যদিকে যৌথ পারিবারিক সম্পত্তিতে কন্যার জন্মসূত্রে কোপারসেনারি অধিকারকে ইচ্ছামতো অস্বীকার করা যায় না। এছাড়া অবিবাহিত কন্যার ভরণপোষণের প্রশ্নও হিন্দু দত্তক ও ভরণপোষণ আইনের অধীনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিবেচিত হয়। তাই পিতার সম্পত্তিতে কন্যার অধিকার সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—বিবাহিত বা অবিবাহিত হওয়ার কারণে কন্যাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর আইনগত উত্তরাধিকার থেকে বাদ দেওয়া যায় না। আইন নারীর পৈতৃক সম্পত্তির অধিকারকে আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী করেছে।

৫. স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর অধিকার: নারীর সম্পত্তির অধিকার শুধু পিতার সম্পত্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; স্ত্রী হিসেবেও একজন মহিলা স্বামীর সম্পত্তিতে আইনগত উত্তরাধিকারী হতে পারেন। হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের অধীনে কোনো হিন্দু পুরুষ উইল না করে মারা গেলে তাঁর সম্পত্তি প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টিত হয়। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা এবং মৃত ব্যক্তির মা—প্রযোজ্য পরিস্থিতিতে প্রত্যেকেই সমান অংশের উত্তরাধিকারী হতে পারেন। এখানে স্ত্রীকে কেবল গৃহিণী হিসেবে নয়, একজন স্বীকৃত আইনগত উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির মালিকানা এবং স্বামীর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখতে হয়। গৃহবধূ নিজে আয় না করলেও পরিবারের পরিচালনা, সন্তান পালন এবং গৃহস্থালি কাজের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন; এই কারণে নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে স্বামীর সম্পত্তিতে তাঁর উত্তরাধিকার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে স্ত্রী ও স্বামীর যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তি, স্বামীর নিজস্ব সম্পত্তি এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির আইনি অবস্থান এক নয়। একইভাবে পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রেও অধিকার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট আইনি পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হয়। তাই কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ হলে দলিল, উইল, উত্তরাধিকারীদের অবস্থা এবং প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন অনুসারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৬. মুসলিম নারীর উত্তরাধিকার অধিকার: মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে নারীর উত্তরাধিকার সম্পর্কিত বিধান হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের থেকে পৃথক। ইসলামি উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় নারীকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল। তবে বহু ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীর লিঙ্গ ও পারিবারিক সম্পর্ক অনুযায়ী অংশের পরিমাণ ভিন্ন হয়। সাধারণভাবে একই স্তরের পুত্র ও কন্যা একসঙ্গে উত্তরাধিকারী হলে পুত্রের অংশ কন্যার দ্বিগুণ হতে পারে। এর পেছনে ইসলামি আইনে পুরুষের উপর পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব আরোপের যুক্তি দেওয়া হয়। তবে সব পরিস্থিতিতে নারী পুরুষের অর্ধেক অংশ পান—এমন ধারণা সঠিক নয়। উত্তরাধিকারীর সম্পর্ক, মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া আত্মীয় এবং অন্যান্য পরিস্থিতির উপর অংশের পরিমাণ নির্ভর করে। স্ত্রী, মা, কন্যা ও অন্যান্য মহিলা আত্মীয়ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকারী হতে পারেন। ফলে মুসলিম নারীর সম্পত্তির অধিকারকে সম্পূর্ণ অধিকারহীনতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে সমান উত্তরাধিকার অংশের প্রশ্নে হিন্দু আইনের ২০০৫ সালের সংশোধনের সঙ্গে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের কাঠামোর পার্থক্য রয়েছে। ভারতে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন প্রচলিত থাকার কারণে নারীর উত্তরাধিকার অধিকারের ক্ষেত্রে একটি বহুমাত্রিক আইনি ব্যবস্থা দেখা যায়। তাই মুসলিম নারীর নির্দিষ্ট সম্পত্তিগত অধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর সম্পর্ক, উত্তরাধিকারীদের সংখ্যা এবং প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন বিবেচনা করা জরুরি।

৭. নারীর সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব ও বাস্তব সমস্যা: আইনগত পরিবর্তন সত্ত্বেও বাস্তবে বহু ভারতীয় নারী এখনও পৈতৃক বা পারিবারিক সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। সামাজিক রীতি, পারিবারিক চাপ, আইনি সচেতনতার অভাব, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নারীর সম্পত্তির অধিকার প্রয়োগের পথে বাধা সৃষ্টি করে। অনেক পরিবারে কন্যাকে বলা হয় যে বিয়ের সময় উপহার বা যৌতুক দেওয়া হয়েছে বলেই পৈতৃক সম্পত্তিতে আর দাবি করা উচিত নয়। কিন্তু সামাজিক রীতি বা পারিবারিক সমঝোতা আইনগত অধিকারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে না। নারীকে তাঁর অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজনে আইনগত সহায়তা গ্রহণ করতে হবে। সম্পত্তির মালিকানা নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে, পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর অবস্থান শক্তিশালী করে এবং নির্ভরশীলতা কমায়। একই সঙ্গে নারীর নামে সম্পত্তি থাকা তাঁকে বিবাহবিচ্ছেদ, বৈধব্য বা পারিবারিক সংকটের মতো পরিস্থিতিতে আর্থিকভাবে নিরাপদ রাখতে পারে। তাই কেবল আইন প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়; আইন সম্পর্কে শিক্ষা, নথিপত্র সংরক্ষণ, উত্তরাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং সহজলভ্য বিচারব্যবস্থাও প্রয়োজন। ভারতীয় বিচারব্যবস্থা ও আইনসভা সময়ের সঙ্গে নারীর সম্পত্তির অধিকারকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। ভবিষ্যতে প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য আইনি অধিকার ও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন—দুইয়েরই প্রয়োজন।

উপসংহার: ভারতে নারীর সম্পত্তির অধিকার দীর্ঘ ঐতিহাসিক বৈষম্যের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়েছে। স্বাধীনতার পর আইনগত সংস্কার, বিশেষত ১৯৫৬ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন এবং ২০০৫ সালের সংশোধন, নারীর উত্তরাধিকার অধিকারে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। বর্তমানে হিন্দু কন্যা যৌথ পারিবারিক সম্পত্তিতে জন্মসূত্রে পুত্রের সমান কোপারসেনারি অধিকার লাভ করেন এবং বিবাহ তাঁর এই অধিকার নষ্ট করে না। একইভাবে স্ত্রী ও মা হিসেবেও নারী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনগত উত্তরাধিকারী হতে পারেন। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনেও নারীর উত্তরাধিকার অধিকার স্বীকৃত, যদিও অংশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পার্থক্য রয়েছে। তবে আইনগত অধিকার থাকা এবং বাস্তবে সেই অধিকার ভোগ করা এক বিষয় নয়। সামাজিক কুসংস্কার, পারিবারিক চাপ ও সচেতনতার অভাব এখনও বড় বাধা। তাই নারীর সম্পত্তির অধিকারকে বাস্তব অর্থে কার্যকর করার জন্য আইনি সচেতনতা, শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য। নারীর সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা শুধু নারীকল্যাণের বিষয় নয়; এটি প্রকৃত লিঙ্গসমতা, সামাজিক ন্যায় এবং নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

সম্পূর্ণ সাজেশন টি ইউটিউবে দেখানো হয়েছে তুমি দেখে আসতে পারো।

তুমি চাইলে সরাসরি PhonePe-এর মাধ্যমে 150 টাকা পেমেন্ট করে সাজেশন সংগ্রহ করতে পার। PhonePe নম্বর: 6295668424 (পেমেন্টের পর স্ক্রিনশট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে PDF COPY পাঠিয়ে দেব।)

🎓

Choose Your Semester

1st Semester থেকে 8th Semester পর্যন্ত সমস্ত Study Materials এক জায়গায়

01

1st Semester

Major • Minor • SEC • VAC • MDC

02

2nd Semester

Major • Minor • SEC • MDC • AEC

03

3rd Semester

Major • Minor • SEC • VAC • MDC • AEC

04

4th Semester

Major 4 • Major 5 • Minor • AEC

05

5th Semester

Major 6 • Major 7 • Minor 1 • Minor 2

06

6th Semester

Major 8 • Major 9 • Major 10

07

7th Semester

Major 11 • Major 12 • Major 13 • Minor 1 • Minor 2

08

8th Semester

Major 14 • Major 15 • Major 16 • Major 17