Kalyani University B.A 7th Semester Bengali Minor Question Answer 2026 | Last Minute Suggestion

Kalyani University Suggestion

Kalyani University B.A 7th Semester Bengali Minor Question Answer 2026 | Last Minute Suggestion

সাহিত্যের বিভিন্ন সংরূপ ও তার প্রয়োগ

Kalyani University B.A 7th Semester Bengali Minor Nep ছোট প্রশ্ন, বড়ো প্রশ্নের উত্তর সহ কমপ্লিট সাজেশন PDF টি পেতে.. তুমি 150 টাকা পেমেন্ট কর। পেমেন্টের পর এক সেকেন্ডের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সাজেশনটি পাবে। ধন্যবাদ। টাকা টি পেমেন্ট করার জন্য নিচে PAY বাটনে ক্লিক কর।

তুমি চাইলে সরাসরি PhonePe-এর মাধ্যমে 150 টাকা পেমেন্ট করে সাজেশন সংগ্রহ করতে পার। PhonePe নম্বর: 6295668424 (পেমেন্টের পর স্ক্রিনশট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে PDF COPY পাঠিয়ে দেব।)

My Phone Number- 6295668424

সম্পূর্ণ সাজেশন টি ইউটিউবে দেখানো হয়েছে তুমি দেখে আসতে পারো।

​"প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা, তোমাদের পড়াশোনা সংক্রান্ত যেকোনো প্রয়োজনে বা কোনো প্রশ্ন থাকলে আমার সাথে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে (WhatsApp) যোগাযোগ করতে পারো। নিচের লিঙ্কে ক্লিক করলেই আমার চ্যাট বক্স খুলে যাবে: ​👉 লিঙ্ক:

• এই সাজেশনের বড়ো প্রশ্ন সংখ্যা 28 টি।
ছোট প্রশ্ন প্রশ্নের উত্তর সহ কমপ্লিট সাজেশন পাবেন।
• নিরক্ষরেখে বলতে পারি এই সাজেশনেরর বাইরে কোন প্রশ্ন উত্তর আসবে না।
• ১০০% তোমরা কমন পাবে।
• এই সাজেশনের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সিলেবাস অনুযায়ী এবং ইউনিট অনুযায়ী সাজানো রয়েছে ।
• তোমরা চাইলে খুব সহজে BUY করতে পারো।
• THANK YOU.

এখানে অল্প কিছু প্রশ্নোত্তর আপলোড করা হয়েছে যদি তোমার মনে হয় সাজেশনটি BUY করতে পারো ।

(সিলেবাস –২০২৬)

সাহিত্যের বিভিন্ন সংরূপ ও তার প্রয়োগ

উপন্যাস
শ্রীকান্ত (প্রথম পর্ব) — শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

নাটক
ডাকঘর — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ছোটগল্প
শিল্পী — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
জলসাঘর — তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
পুঁইমাচা — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

কবিতা
অপরাজিতা — যতীন্দ্রমোহন বাগচী
আমার কৈফিয়ৎ — কাজী নজরুল ইসলাম
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি — জীবনানন্দ দাশ
সেই নারী — কবিতা সিংহ

▲ উপন্যাস▲ শ্রীকান্ত (প্রথম পর্ব) — শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

*****1) প্রশ্ন. 'শ্রীকান্ত' (১ম পর্ব)-কে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস বলা যায় কী? এ বিষয়ে তোমার অভিমত দাও।(৫/১০)

উত্তর : প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এটি মূলত ভ্রমণকাহিনি, আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস এবং ব্যক্তিমানসনির্ভর আখ্যানের বৈশিষ্ট্যকে একসূত্রে গ্রথিত করেছে। বিশেষত প্রথম পর্বে কথক ও নায়ক শ্রীকান্তের বাল্য-কৈশোরের অভিজ্ঞতা, নানা মানুষের সঙ্গে পরিচয়, দেশভ্রমণ, প্রেম, সমাজের অবহেলিত মানুষের জীবন এবং লেখকের নিজস্ব জীবনবোধ এমন ঘনিষ্ঠভাবে মিশে আছে যে ‘শ্রীকান্ত’-কে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস বলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে এটি হুবহু শরৎচন্দ্রের আত্মজীবনী নয়; বরং তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, মানসিক প্রবণতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সৃজনশীল রূপায়ণ।

১. আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের স্বরূপ ও ‘শ্রীকান্ত’-এর সঙ্গে তার সম্পর্ক : কোনো উপন্যাসের নায়ক নিজে নিজের জীবনের কথা বললেই তাকে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস বলা যায় না। আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসে লেখকের ব্যক্তিগত জীবন, অভিজ্ঞতা, চিন্তাভাবনা, মানসিক প্রবণতা ও জীবনদর্শন এমনভাবে প্রতিফলিত হয় যে কাহিনির চরিত্রের মধ্যে লেখকের নিজের সত্তাকে অনেকাংশে শনাক্ত করা যায়। ইংরেজি সাহিত্যে শার্লট ব্রন্টি, এমিলি ব্রন্টি, অ্যান ব্রন্টি প্রমুখের রচনায় এবং চার্লস ডিকেন্সের ‘ডেভিড কপারফিল্ড’-এ লেখকের ব্যক্তিজীবনের নানা অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যায়। ‘শ্রীকান্ত’ও একই অর্থে আত্মজীবনীমূলক। এখানে শ্রীকান্তের জীবন ও শরৎচন্দ্রের জীবনের মধ্যে বহু সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। লেখক নিজের জীবনের ঘটনাকে সরাসরি পুনরাবৃত্তি না করে কল্পনা, শিল্পবোধ ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে নতুন আখ্যানের রূপ দিয়েছেন। তাই ‘শ্রীকান্ত’কে নিছক আত্মজীবনী না বলে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস বলা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

২. ভাগলপুরের জীবন ও শ্রীকান্তের বাল্য-কৈশোর : শরৎচন্দ্রের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ভাগলপুরে তাঁর অবস্থান। মাতুলালয়ে থাকার সময় তিনি যে পরিবেশ, প্রকৃতি, মানুষ ও জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, তার স্পষ্ট ছাপ ‘শ্রীকান্ত’-এর প্রথম পর্বে দেখা যায়। শ্রীকান্তের বাল্য ও কৈশোরের জীবনচিত্রে ভাগলপুরের পরিবেশ বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গঙ্গার যে প্রাকৃতিক দৃশ্য, নদীতীরবর্তী জীবন এবং গ্রামীণ পরিবেশের বর্ণনা উপন্যাসে পাওয়া যায়, তা লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার স্মৃতি বহন করে। ফলে শ্রীকান্তের শৈশবের নানা ঘটনা কেবল কল্পনার ফসল নয়; তার পেছনে শরৎচন্দ্রের নিজস্ব জীবনানুভবের যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতার শিল্পিত রূপান্তরই উপন্যাসটির আত্মজীবনীমূলক চরিত্রকে দৃঢ় করেছে।

৩. রাজেন মজুমদার ও ইন্দ্রনাথ চরিত্রের সাদৃশ্য : শরৎচন্দ্রের জীবনে রাজেন মজুমদার নামে এক নির্ভীক, পরোপকারী ও মহৎপ্রাণ যুবকের প্রভাব ছিল। তিনি সাহসী, দুঃসাহসিক এবং সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ‘শ্রীকান্ত’-এর ইন্দ্রনাথ চরিত্রের মধ্যে সেই রাজেন মজুমদারের ছায়া স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্তের জীবনে এক অসাধারণ প্রভাব বিস্তার করে। সে নির্ভীক, দুঃসাহসী, বিপদকে তুচ্ছজ্ঞান করে এবং মানুষের প্রতি তার গভীর মমতা রয়েছে। নিশীথ রাতে শ্রীকান্তকে সঙ্গে নিয়ে বিপজ্জনক অভিযানে বেরিয়ে পড়া, নদী-জঙ্গল ও নানা বিপদের মুখোমুখি হওয়া তার দুঃসাহসিক চরিত্রের পরিচয় দেয়। এই ইন্দ্রনাথের মধ্যে শরৎচন্দ্রের পরিচিত এক বাস্তব মানুষের প্রতিরূপ দেখতে পাওয়া যায়। ফলে উপন্যাসের চরিত্র নির্মাণেও লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ব্যবহৃত হয়েছে।

৪. সন্ন্যাসীজীবন, পর্যটন ও শিকার-অভিজ্ঞতার প্রতিফলন : শরৎচন্দ্রের জীবনে একসময় নানা কারণে নিরুদ্দেশ হয়ে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি কখনো সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতারই শিল্পিত প্রতিফলন দেখা যায় শ্রীকান্তের চরিত্রে। শ্রীকান্তও স্থির, বাঁধাধরা জীবন পছন্দ করে না; সে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়ায় এবং বিচিত্র মানুষের সংস্পর্শে আসে। তার জীবন যেন এক নিরন্তর পর্যটনের কাহিনি। আবার শরৎচন্দ্রের শিকার, মাছ ধরা এবং পাখি শিকারের অভিজ্ঞতাও উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে। শ্রীকান্তের সহপাঠী ও রাজকুমারের আমন্ত্রণে শিকার-পার্টিতে যোগ দেওয়ার ঘটনায় সেই বাস্তব অভিজ্ঞতার ছায়া রয়েছে। ফলে উপন্যাসের ভ্রমণ ও শিকার-সংক্রান্ত অংশগুলোও লেখকের ব্যক্তিগত জীবন থেকে উৎসারিত বলে মনে হয়।

৫. সাপুড়ে জীবন ও অন্নদাদিদির কাহিনিতে বাস্তব অভিজ্ঞতা : শরৎচন্দ্রের জীবনের আরও কিছু বিচিত্র অভিজ্ঞতা ‘শ্রীকান্ত’-এর প্রথম পর্বে রূপ পেয়েছে। তিনি সাপ ধরতে পারতেন এবং সাপুড়েদের জীবনযাত্রা সম্পর্কেও প্রত্যক্ষ ধারণা লাভ করেছিলেন। এই অভিজ্ঞতার ছাপ শাহজী ও অন্নদাদিদির জীবনচিত্রে দেখা যায়। অন্নদাদিদির ঘরে অনায়াসে বিষধর সাপ প্রবেশ করা এবং তাঁর সাহসের সঙ্গে সেই সাপ ধরে ঝাঁপিতে পুরে দেওয়ার ঘটনায় বাস্তব অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। অন্নদাদিদির চরিত্রটি শুধু রোমাঞ্চকর নয়, গভীর মানবিকতায়ও উজ্জ্বল। স্বামীর প্রতি তাঁর অপরিসীম আনুগত্য, আত্মত্যাগ ও দুঃখসহিষ্ণুতা শ্রীকান্তকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। এই চরিত্রের মাধ্যমে শরৎচন্দ্র সমাজের প্রচলিত বিচারবোধের বিরুদ্ধে মানবিকতার দাবি প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত অনুভূতির এই মিলন ‘শ্রীকান্ত’-কে আত্মজীবনীমূলক বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে।

৬. শরৎচন্দ্রের সংবেদনশীলতা ও নারীর প্রতি সহানুভূতির প্রতিফলন : শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিমানসের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গভীর মানবিকতা। মানুষ তো বটেই, জীবজন্তুর দুঃখ-কষ্টও তাঁকে বিচলিত করত। ‘শ্রীকান্ত’-এর মধ্যেও এই সংবেদনশীলতা প্রবলভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ইন্দ্রনাথের সঙ্গে নিশীথ অভিযানে গিয়ে একটি অকালমৃত বালকের দেহ দেখে শ্রীকান্তের মনে যে গভীর বেদনা জেগে ওঠে, তাতে লেখকের নিজের দরদী মনটির পরিচয় পাওয়া যায়। একইভাবে সমাজের নিপীড়িত ও অবহেলিত নারীদের প্রতি শরৎচন্দ্রের গভীর সহানুভূতি অন্নদাদিদি, নিরুদিদি ও রাজলক্ষ্মীর চরিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষত নিরুদিদির কাহিনিতে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সরাসরি ছাপ রয়েছে। বাল্যবিধবা নিরুদিদি ছিলেন পরোপকারী, সেবাপরায়ণা ও ধর্মপ্রাণ; কিন্তু সমাজের নিষ্ঠুরতা ও কুসংস্কারের কারণে জীবনের শেষপর্যায়ে তিনি নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত হয়ে পড়েন। শরৎচন্দ্র নিজেও এমন এক নিরুদিদির জীবনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। ‘শ্রীকান্ত’-এর নিরুদিদির করুণ পরিণতি তাই নিছক কল্পনা নয়; লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সমাজ-অভিজ্ঞতারই শিল্পিত প্রকাশ। নারীর প্রতি এই গভীর সহানুভূতিই উপন্যাসে শরৎচন্দ্রের নিজস্ব মানসকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

৭. আত্মজীবনীমূলক হলেও নিছক আত্মজীবনী নয় : উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বকে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস হিসেবে গ্রহণ করা যথার্থ। শরৎচন্দ্রের ভাগলপুরের জীবন, রাজেন মজুমদারের সঙ্গে পরিচয়, সন্ন্যাসীসুলভ পর্যটন, শিকার ও মাছ ধরার অভিজ্ঞতা, সাপুড়েদের জীবন সম্পর্কে জ্ঞান, বাস্তব জীবনের নারীদের স্মৃতি এবং সমাজের অবহেলিত মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি—সবই শ্রীকান্তের জীবন ও মননের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। আবার রাজলক্ষ্মী, ইন্দ্রনাথ, অন্নদাদিদি প্রমুখ চরিত্র কেবল বাস্তব ব্যক্তির অনুলিপি নয়; লেখকের কল্পনা ও শিল্পসৃষ্টির মাধ্যমে তারা স্বতন্ত্র সাহিত্যিক চরিত্রে পরিণত হয়েছে। শ্রীকান্তের চোখ দিয়ে লেখক সমাজ, মানুষ, প্রেম, নারীজীবন, ধর্ম ও নৈতিকতার নানা প্রশ্নকে দেখেছেন। তাই উপন্যাসটি লেখকের জীবনের হুবহু বিবরণ নয়, বরং আত্মজীবনের উপাদানকে অবলম্বন করে নির্মিত এক শিল্পিত জীবনকাহিনি। এই কারণেই একে একই সঙ্গে আত্মজীবনীমূলক, ভ্রমণনির্ভর ও ব্যক্তিমানসনির্ভর উপন্যাস বলা যায়।

পরিশেষে বলা যায়, ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্বকে নিছক আত্মজীবনী বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এর আত্মজীবনীমূলক চরিত্র অস্বীকার করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, পরিচিত মানুষ, ভ্রমণ, দুঃসাহসিকতা এবং বিশেষত তাঁর মানবিক ও সমাজসচেতন মানস শ্রীকান্তের চরিত্র ও কাহিনির মধ্যে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে লেখক বাস্তব জীবনকে সরাসরি তুলে ধরেননি; কল্পনা, শিল্পবোধ ও সাহিত্যিক রূপান্তরের মাধ্যমে তাকে একটি স্বতন্ত্র উপন্যাসে পরিণত করেছেন। তাই ‘শ্রীকান্ত’ (প্রথম পর্ব) একটি আত্মজীবনীমূলক ভ্রমণকেন্দ্রিক উপন্যাস, যেখানে শরৎচন্দ্রের ব্যক্তিজীবনের ছায়া শ্রীকান্তের জীবন ও মানসের মধ্যে অত্যন্ত জীবন্তভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

▲ ছোটগল্প▲ শিল্পী — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

*****2) প্রশ্ন. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'শিল্পী' গল্পটিতে মদন তাঁতির চরিত্রটি যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তার পরিচয় দাও। (১০)

উত্তর : বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ছোটোগল্পকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মদন-তাঁতি। স্বল্প পরিসরের এই গল্পে লেখক একজন দরিদ্র তাঁতির জীবনসংগ্রাম, শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা, আত্মমর্যাদাবোধ, সংবেদনশীলতা এবং আদর্শের প্রতি অবিচল বিশ্বাসকে অত্যন্ত সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন। মদন শুধু জীবিকার জন্য তাঁত বোনে না; তাঁত তার কাছে শিল্পসাধনার মাধ্যম। সংসারের চরম দারিদ্র্য ও অভাবের মধ্যেও সে শিল্পের মানের সঙ্গে আপস করতে রাজি নয়। তাই মদন-তাঁতির চরিত্রে একদিকে যেমন বাস্তবজীবনের কঠোরতা, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে একজন প্রকৃত শিল্পীর আত্মমর্যাদা ও সৃষ্টিশীলতার দীপ্তি।

১. বংশপরম্পরায় তাঁতি ও দক্ষ বয়নশিল্পী: মদন-তাঁতি বংশপরম্পরায় তাঁতি। সাত পুরুষ ধরে তাদের পরিবারের তাঁতের কারবার চলে আসছে এবং তার বাবাও ছিলেন একজন দক্ষ তাঁতি। ফলে তাঁত বোনা তার কাছে কেবল পেশা নয়, পারিবারিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। ছোটোবেলা থেকেই সে তাঁতের কাজের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছে এবং নিজের প্রতিভা ও নিষ্ঠায় একজন দক্ষ বয়নশিল্পীতে পরিণত হয়েছে। তাঁতিপাড়ার অন্য তাঁতিদের তুলনায় মদনের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তার বোনা কাপড়ের মান, নকশা ও সৌন্দর্যের প্রতি সে অত্যন্ত যত্নশীল। সাধারণভাবে একজন তাঁতি যত বেশি কাপড় উৎপাদন করবে, তার উপার্জন তত বাড়বে; কিন্তু মদনের কাছে উৎপাদনের পরিমাণের চেয়ে কাপড়ের গুণমান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তার শিল্পীসত্তার ভিত্তি গড়ে উঠেছে বংশগত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব প্রতিভার সমন্বয়ে।

২. শিল্পের মান রক্ষায় আত্মমর্যাদাবোধ: মদন-তাঁতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য তার প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ। সে কখনো সস্তা বা নিম্নমানের কাপড় বুনতে চায় না। তার এই অনমনীয় মনোভাবের জন্য তাঁতিপাড়ায় একটি প্রচলিত কথা ছিল—“মদন যখন গামছা বুনবে।” অর্থাৎ মদনের মতো শিল্পীর পক্ষে সাধারণ গামছা বোনা যেমন অসম্ভব, তেমনই তার শিল্পীসত্তার সঙ্গে নিম্নমানের কাজ বেমানান। এই প্রবাদের মধ্যেই মদনের শিল্পী হিসেবে খ্যাতি ও স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ পেয়েছে। সে জানে, সামান্য বেশি উপার্জনের জন্য নিম্নমানের কাপড় তৈরি করলে তার শিল্পের মর্যাদা নষ্ট হবে। তাই দারিদ্র্য, অভাব বা সামাজিক চাপ কোনো কিছুই তাকে নিজের শিল্পের মান থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। তার এই আত্মমর্যাদাবোধই তাকে সাধারণ তাঁতির স্তর থেকে একজন সত্যিকারের শিল্পীর মর্যাদায় উন্নীত করেছে।

৩. শিল্পের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও নিষ্ঠা: মদনের বয়নশিল্পের প্রতি যে আকর্ষণ, তা নিছক জীবিকা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা নয়; এর মধ্যে একজন প্রকৃত শিল্পীর গভীর ভালোবাসা ও সাধনা রয়েছে। তাঁত তার কাছে শুধু অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নয়, সৃষ্টির একটি মাধ্যম। তাই ভালো সুতো পেলে সে নিজের কল্পনা ও দক্ষতা দিয়ে সুন্দর কাপড় বুনতে চায়। অন্যদিকে নিম্নমানের সুতো দিয়ে কাপড় বোনার প্রস্তাব তার শিল্পীসত্তাকে আহত করে। এমনকি একসময় সংসারের প্রবল অভাব ও আসন্নপ্রসবা স্ত্রীর চিন্তায় সে সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তখন ভুবন ঘোষালের কাছে সে ভালো ও দামি কিছু বোনার জন্য সুতো চেয়েছিল। কিন্তু নিম্নমানের সুতো হাতে পেয়ে তার চোখে জল এসে যায়। সে সেই সুতো দিয়ে কাপড় বুনতে পারেনি। গভীর রাতে সে তাঁত চালালেও তাতে কোনো সুতো ছিল না। খালি তাঁত চালিয়ে সে যেন নিজের শিল্পীসত্তাকে জাগিয়ে রাখে। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, শিল্পের প্রতি তার ভালোবাসা কত গভীর।

৪. দারিদ্র্যের মধ্যেও আদর্শে অটল: মদনের জীবনে দারিদ্র্য অত্যন্ত নির্মম বাস্তবতা। সংসারে অভাব রয়েছে, স্ত্রী আসন্নপ্রসবা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত—তবু সে নিজের শিল্পের আদর্শকে বিকিয়ে দিতে প্রস্তুত নয়। একজন সাধারণ দরিদ্র শ্রমিকের কাছে এই পরিস্থিতিতে বেশি মজুরির জন্য নিম্নমানের সুতোয় কাজ করা স্বাভাবিক হতে পারত। কিন্তু মদন সেই সহজ পথ বেছে নেয় না। তার কাছে পেটের ক্ষুধা যেমন সত্য, তেমনি শিল্পের মর্যাদাও সত্য। এই দ্বন্দ্বই চরিত্রটিকে গভীরতা দিয়েছে। সে বুঝতে পারে যে নিম্নমানের কাপড় বুনে কিছু অর্থ উপার্জন করা সম্ভব হলেও তাতে তার শিল্পীর আত্মসম্মান ক্ষুণ্ণ হবে। তাই সে অভাবকে সহ্য করে, কিন্তু শিল্পের সঙ্গে বেইমানি করে না। তার এই অবস্থান তাকে শুধু দক্ষ তাঁতি নয়, আদর্শনিষ্ঠ শিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

৫. সংবেদনশীল অথচ রাগী ও অসহিষ্ণু স্বভাব: মদনের চরিত্র সম্পূর্ণ একমাত্রিক নয়। তার মধ্যে যেমন শিল্পীর কোমলতা ও সংবেদনশীলতা আছে, তেমনই রয়েছে রাগ, জেদ ও অসহিষ্ণুতা। তাঁত না চালিয়ে পায়ে খিঁচ ধরলে সে হাউমাউ করে চিৎকার করে ওঠে। আবার তার মাসি যখন কানের কাছে মুখ নিয়ে ভুবন ঘোষালকে প্রণাম করার কথা বলে, তখন মদন বিরক্ত হয়ে ওঠে এবং রাগের সঙ্গে তাকে দূরে সরে যেতে বলে। এই আচরণ তার অস্থির ও খিটখিটে স্বভাবের পরিচয় দেয়। তবে তার এই রাগকে কেবল নেতিবাচক দিক হিসেবে দেখলে চরিত্রটির পূর্ণতা বোঝা যায় না। তার সংবেদনশীলতা এত তীব্র যে শিল্পের মানের সঙ্গে সামান্য আপসও তাকে ভেতর থেকে আঘাত করে। ফলে তার রাগ, জেদ ও অসহিষ্ণুতার মধ্যেও একজন শিল্পীর তীব্র অনুভূতিশীল মন কাজ করে। বাস্তবজীবনের চাপ ও শিল্পীসত্তার দ্বন্দ্ব তার চরিত্রকে আরও মানবিক করে তুলেছে।

৬. তাঁতিদের আদর্শনিষ্ঠ নেতা: মদন শুধু নিজের শিল্পের মর্যাদা রক্ষা করেই থেমে থাকে না; সে সমগ্র তাঁতিসমাজের স্বার্থ ও প্রতিশ্রুতির কথাও ভাবে। তাঁতিপাড়ায় তার একটি নেতৃত্বের মর্যাদা রয়েছে। ভুবন ঘোষালের নিম্নমানের সুতো নিয়ে তাঁতিদের কাজ করার প্রসঙ্গ উঠলে মদন স্পষ্টভাবে প্রতিবাদ করে। তার বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে গভীর নৈতিকতা—সে নিজের লাভের জন্য অন্য তাঁতিদের সঙ্গে করা কথা ভাঙতে চায় না। তার কাছে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সমষ্টিগত স্বার্থ ও দেওয়া কথার মূল্য বেশি। সে জানে, একবার তাঁতিরা নিম্নমানের সুতো গ্রহণ করলে তাদের শিল্পের সুনাম নষ্ট হবে এবং ভবিষ্যতে তারা শোষণের শিকার হবে। তাই তার প্রতিবাদ শুধু শিল্পের মান রক্ষার প্রতিবাদ নয়, শ্রমজীবী মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষারও প্রতিবাদ। এই কারণে মদনকে গল্পে তাঁতিদের একজন আদর্শনিষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে দেখা যায়।

৭. শিল্পীসত্তার অপরাজেয়তা ও চরিত্রের তাৎপর্য: মদন-তাঁতি চরিত্রের সর্বোচ্চ বৈশিষ্ট্য তার অপরাজেয় শিল্পীসত্তা। জীবনের কঠোর বাস্তবতা তাকে বারবার পরীক্ষার সামনে দাঁড় করায়। একদিকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সংসারের দুশ্চিন্তা; অন্যদিকে শিল্পের আদর্শ ও আত্মমর্যাদা—এই দুইয়ের সংঘাতে মদন শেষ পর্যন্ত শিল্পের পক্ষেই দাঁড়ায়। ভুবন ঘোষালের দেওয়া নিম্নমানের সুতো সে গ্রহণ করতে পারে না। তার চোখে জল আসে, কিন্তু সে নিজের শিল্পের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। এমনকি খালি তাঁত চালানোর ঘটনাটি প্রতীকী অর্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতো নেই, তবু তাঁত চলছে—অর্থাৎ বাস্তব জীবন তাকে যতই থামিয়ে দিতে চায়, তার অন্তরের শিল্পীসত্তা ততই সৃষ্টির দিকে তাকে চালিত করে। তাই মদন কেবল একজন তাঁতি নয়; সে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শিল্পীসত্তার প্রতীক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার চরিত্রের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে সত্যিকারের শিল্পী অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হলেও আদর্শের কাছে পরাজিত হয় না।

পরিশেষে বলা যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ গল্পের মদন-তাঁতি চরিত্রটি বাংলা ছোটোগল্পে এক স্মরণীয় শিল্পীচরিত্র। বংশপরম্পরায় দক্ষ তাঁতি হওয়ার পাশাপাশি সে আত্মমর্যাদাশীল, শিল্পনিষ্ঠ, সংবেদনশীল, জেদি, আদর্শবান এবং নেতৃত্বদানের ক্ষমতাসম্পন্ন। দারিদ্র্য ও সংসারের সংকট তাকে দুর্বল করলেও তার শিল্পীসত্তাকে পরাজিত করতে পারে না। নিম্নমানের সুতোয় কাজ না করে এবং খালি তাঁত চালিয়ে সে যেন কঠোর বাস্তবতার বিরুদ্ধে একজন শিল্পীর নীরব প্রতিবাদ জানায়। তাই মদন-তাঁতি চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা, শ্রমজীবী মানুষের আত্মমর্যাদা এবং আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন।

▲ কবিতা▲ বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি — জীবনানন্দ দাশ

*****3) প্রশ্ন. 'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি' কবিতায় প্রকৃতির প্রসঙ্গে যে পৌরাণিক কাহিনীর চিত্র অঙ্কন করেছেন তার বর্ণনা দাও।(৫/১০)

উত্তর : বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ছোটোগল্পকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মদন-তাঁতি। স্বল্প পরিসরের এই গল্পে লেখক একজন দরিদ্র তাঁতির জীবনসংগ্রাম, শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা, আত্মমর্যাদাবোধ, সংবেদনশীলতা এবং আদর্শের প্রতি অবিচল বিশ্বাসকে অত্যন্ত সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন। মদন শুধু জীবিকার জন্য তাঁত বোনে না; তাঁত তার কাছে শিল্পসাধনার মাধ্যম। সংসারের চরম দারিদ্র্য ও অভাবের মধ্যেও সে শিল্পের মানের সঙ্গে আপস করতে রাজি নয়। তাই মদন-তাঁতির চরিত্রে একদিকে যেমন বাস্তবজীবনের কঠোরতা, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে একজন প্রকৃত শিল্পীর আত্মমর্যাদা ও সৃষ্টিশীলতার দীপ্তি।

১. বংশপরম্পরায় তাঁতি ও দক্ষ বয়নশিল্পী : মদন-তাঁতি বংশপরম্পরায় তাঁতি। সাত পুরুষ ধরে তাদের পরিবারের তাঁতের কারবার চলে আসছে এবং তার বাবাও ছিলেন একজন দক্ষ তাঁতি। ফলে তাঁত বোনা তার কাছে কেবল পেশা নয়, পারিবারিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। ছোটোবেলা থেকেই সে তাঁতের কাজের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছে এবং নিজের প্রতিভা ও নিষ্ঠায় একজন দক্ষ বয়নশিল্পীতে পরিণত হয়েছে। তাঁতিপাড়ার অন্য তাঁতিদের তুলনায় মদনের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তার বোনা কাপড়ের মান, নকশা ও সৌন্দর্যের প্রতি সে অত্যন্ত যত্নশীল। সাধারণভাবে একজন তাঁতি যত বেশি কাপড় উৎপাদন করবে, তার উপার্জন তত বাড়বে; কিন্তু মদনের কাছে উৎপাদনের পরিমাণের চেয়ে কাপড়ের গুণমান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তার শিল্পীসত্তার ভিত্তি গড়ে উঠেছে বংশগত শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব প্রতিভার সমন্বয়ে।

২. শিল্পের মান রক্ষায় আত্মমর্যাদাবোধ : মদন-তাঁতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য তার প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ। সে কখনো সস্তা বা নিম্নমানের কাপড় বুনতে চায় না। তার এই অনমনীয় মনোভাবের জন্য তাঁতিপাড়ায় একটি প্রচলিত কথা ছিল—“মদন যখন গামছা বুনবে।” অর্থাৎ মদনের মতো শিল্পীর পক্ষে সাধারণ গামছা বোনা যেমন অসম্ভব, তেমনই তার শিল্পীসত্তার সঙ্গে নিম্নমানের কাজ বেমানান। এই প্রবাদের মধ্যেই মদনের শিল্পী হিসেবে খ্যাতি ও স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ পেয়েছে। সে জানে, সামান্য বেশি উপার্জনের জন্য নিম্নমানের কাপড় তৈরি করলে তার শিল্পের মর্যাদা নষ্ট হবে। তাই দারিদ্র্য, অভাব বা সামাজিক চাপ কোনো কিছুই তাকে নিজের শিল্পের মান থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। তার এই আত্মমর্যাদাবোধই তাকে সাধারণ তাঁতির স্তর থেকে একজন সত্যিকারের শিল্পীর মর্যাদায় উন্নীত করেছে।

৩. শিল্পের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও নিষ্ঠা : মদনের বয়নশিল্পের প্রতি যে আকর্ষণ, তা নিছক জীবিকা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা নয়; এর মধ্যে একজন প্রকৃত শিল্পীর গভীর ভালোবাসা ও সাধনা রয়েছে। তাঁত তার কাছে শুধু অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নয়, সৃষ্টির একটি মাধ্যম। তাই ভালো সুতো পেলে সে নিজের কল্পনা ও দক্ষতা দিয়ে সুন্দর কাপড় বুনতে চায়। অন্যদিকে নিম্নমানের সুতো দিয়ে কাপড় বোনার প্রস্তাব তার শিল্পীসত্তাকে আহত করে। এমনকি একসময় সংসারের প্রবল অভাব ও আসন্নপ্রসবা স্ত্রীর চিন্তায় সে সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তখন ভুবন ঘোষালের কাছে সে ভালো ও দামি কিছু বোনার জন্য সুতো চেয়েছিল। কিন্তু নিম্নমানের সুতো হাতে পেয়ে তার চোখে জল এসে যায়। সে সেই সুতো দিয়ে কাপড় বুনতে পারেনি। গভীর রাতে সে তাঁত চালালেও তাতে কোনো সুতো ছিল না। খালি তাঁত চালিয়ে সে যেন নিজের শিল্পীসত্তাকে জাগিয়ে রাখে। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, শিল্পের প্রতি তার ভালোবাসা কত গভীর।

৪. দারিদ্র্যের মধ্যেও আদর্শে অটল : মদনের জীবনে দারিদ্র্য অত্যন্ত নির্মম বাস্তবতা। সংসারে অভাব রয়েছে, স্ত্রী আসন্নপ্রসবা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত—তবু সে নিজের শিল্পের আদর্শকে বিকিয়ে দিতে প্রস্তুত নয়। একজন সাধারণ দরিদ্র শ্রমিকের কাছে এই পরিস্থিতিতে বেশি মজুরির জন্য নিম্নমানের সুতোয় কাজ করা স্বাভাবিক হতে পারত। কিন্তু মদন সেই সহজ পথ বেছে নেয় না। তার কাছে পেটের ক্ষুধা যেমন সত্য, তেমনি শিল্পের মর্যাদাও সত্য। এই দ্বন্দ্বই চরিত্রটিকে গভীরতা দিয়েছে। সে বুঝতে পারে যে নিম্নমানের কাপড় বুনে কিছু অর্থ উপার্জন করা সম্ভব হলেও তাতে তার শিল্পীর আত্মসম্মান ক্ষুণ্ণ হবে। তাই সে অভাবকে সহ্য করে, কিন্তু শিল্পের সঙ্গে বেইমানি করে না। তার এই অবস্থান তাকে শুধু দক্ষ তাঁতি নয়, আদর্শনিষ্ঠ শিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

৫. সংবেদনশীল অথচ রাগী ও অসহিষ্ণু স্বভাব : মদনের চরিত্র সম্পূর্ণ একমাত্রিক নয়। তার মধ্যে যেমন শিল্পীর কোমলতা ও সংবেদনশীলতা আছে, তেমনই রয়েছে রাগ, জেদ ও অসহিষ্ণুতা। তাঁত না চালিয়ে পায়ে খিঁচ ধরলে সে হাউমাউ করে চিৎকার করে ওঠে। আবার তার মাসি যখন কানের কাছে মুখ নিয়ে ভুবন ঘোষালকে প্রণাম করার কথা বলে, তখন মদন বিরক্ত হয়ে ওঠে এবং রাগের সঙ্গে তাকে দূরে সরে যেতে বলে। এই আচরণ তার অস্থির ও খিটখিটে স্বভাবের পরিচয় দেয়। তবে তার এই রাগকে কেবল নেতিবাচক দিক হিসেবে দেখলে চরিত্রটির পূর্ণতা বোঝা যায় না। তার সংবেদনশীলতা এত তীব্র যে শিল্পের মানের সঙ্গে সামান্য আপসও তাকে ভেতর থেকে আঘাত করে। ফলে তার রাগ, জেদ ও অসহিষ্ণুতার মধ্যেও একজন শিল্পীর তীব্র অনুভূতিশীল মন কাজ করে। বাস্তবজীবনের চাপ ও শিল্পীসত্তার দ্বন্দ্ব তার চরিত্রকে আরও মানবিক করে তুলেছে।

৬. তাঁতিদের আদর্শনিষ্ঠ নেতা : মদন শুধু নিজের শিল্পের মর্যাদা রক্ষা করেই থেমে থাকে না; সে সমগ্র তাঁতিসমাজের স্বার্থ ও প্রতিশ্রুতির কথাও ভাবে। তাঁতিপাড়ায় তার একটি নেতৃত্বের মর্যাদা রয়েছে। ভুবন ঘোষালের নিম্নমানের সুতো নিয়ে তাঁতিদের কাজ করার প্রসঙ্গ উঠলে মদন স্পষ্টভাবে প্রতিবাদ করে। তার বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে গভীর নৈতিকতা—সে নিজের লাভের জন্য অন্য তাঁতিদের সঙ্গে করা কথা ভাঙতে চায় না। তার কাছে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সমষ্টিগত স্বার্থ ও দেওয়া কথার মূল্য বেশি। সে জানে, একবার তাঁতিরা নিম্নমানের সুতো গ্রহণ করলে তাদের শিল্পের সুনাম নষ্ট হবে এবং ভবিষ্যতে তারা শোষণের শিকার হবে। তাই তার প্রতিবাদ শুধু শিল্পের মান রক্ষার প্রতিবাদ নয়, শ্রমজীবী মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষারও প্রতিবাদ। এই কারণে মদনকে গল্পে তাঁতিদের একজন আদর্শনিষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে দেখা যায়।

৭. শিল্পীসত্তার অপরাজেয়তা ও চরিত্রের তাৎপর্য : মদন-তাঁতি চরিত্রের সর্বোচ্চ বৈশিষ্ট্য তার অপরাজেয় শিল্পীসত্তা। জীবনের কঠোর বাস্তবতা তাকে বারবার পরীক্ষার সামনে দাঁড় করায়। একদিকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সংসারের দুশ্চিন্তা; অন্যদিকে শিল্পের আদর্শ ও আত্মমর্যাদা—এই দুইয়ের সংঘাতে মদন শেষ পর্যন্ত শিল্পের পক্ষেই দাঁড়ায়। ভুবন ঘোষালের দেওয়া নিম্নমানের সুতো সে গ্রহণ করতে পারে না। তার চোখে জল আসে, কিন্তু সে নিজের শিল্পের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। এমনকি খালি তাঁত চালানোর ঘটনাটি প্রতীকী অর্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতো নেই, তবু তাঁত চলছে—অর্থাৎ বাস্তব জীবন তাকে যতই থামিয়ে দিতে চায়, তার অন্তরের শিল্পীসত্তা ততই সৃষ্টির দিকে তাকে চালিত করে। তাই মদন কেবল একজন তাঁতি নয়; সে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শিল্পীসত্তার প্রতীক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার চরিত্রের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে সত্যিকারের শিল্পী অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের কাছে পরাজিত হলেও আদর্শের কাছে পরাজিত হয় না।

পরিশেষে বলা যায়: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পী’ গল্পের মদন-তাঁতি চরিত্রটি বাংলা ছোটোগল্পে এক স্মরণীয় শিল্পীচরিত্র। বংশপরম্পরায় দক্ষ তাঁতি হওয়ার পাশাপাশি সে আত্মমর্যাদাশীল, শিল্পনিষ্ঠ, সংবেদনশীল, জেদি, আদর্শবান এবং নেতৃত্বদানের ক্ষমতাসম্পন্ন। দারিদ্র্য ও সংসারের সংকট তাকে দুর্বল করলেও তার শিল্পীসত্তাকে পরাজিত করতে পারে না। নিম্নমানের সুতোয় কাজ না করে এবং খালি তাঁত চালিয়ে সে যেন কঠোর বাস্তবতার বিরুদ্ধে একজন শিল্পীর নীরব প্রতিবাদ জানায়। তাই মদন-তাঁতি চরিত্রের মধ্য দিয়ে লেখক শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা, শ্রমজীবী মানুষের আত্মমর্যাদা এবং আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন।

এখানে অল্প কিছু প্রশ্নোত্তর আপলোড করা হয়েছে যদি তোমার মনে হয় সাজেশনটি BUY করতে পারো ।

অথবা আপনি চাইলে সরাসরি PhonePe-এর মাধ্যমে 150 টাকা পেমেন্ট করে সাজেশন সংগ্রহ করতে পারেন। PhonePe নম্বর: 6295668424 (পেমেন্টের পর স্ক্রিনশট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে PDF COPY পাঠিয়ে দেব।)

সম্পূর্ণ সাজেশন টি ইউটিউবে দেখানো হয়েছে তুমি দেখে আসতে পারো।

Add Your Heading TeKalyani University B.A 7th Semester Bengali Minor Question Answer 2026,B.A 7th Semester Bengali Minor Question Answer,Kalyani University B.A 7th Semester Bengali Minor Question Answer,7th semester Bengali minor suggestion,Bengali minor question paper 2026,Bengali minor syllabus 2026,Bengali Minor,Bengali Minor Question Answer,7th Semester Bengali Minor Question Answer,7th semester Bengali minor long questions,scjob dot in,7th semester Bengali minor question paperxt Here

Leave a Comment